মরণের শপথ নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিলেন ইয়াদ আলী

মরণের শপথ নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিলেন ইয়াদ আলী

আসাফুর রহমান কাজল
৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে আমরা মনে মনে প্রস্তুত হতে লাগলাম। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকার ইপিআর’র ঘটনা শুনে আমাদের গায়ের রক্ত টগবগ করে উঠলো। পরের দিন শুনতে পেলাম যশোর ইপিআর’র কোয়ার্টার (অস্ত্রাগার) তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আমি কয়েকজন ইপিআর সদস্যকে নিয়ে সেই তালা ভেঙে দিলাম। সবার হাতে অস্ত্র তুলে দিলাম। সে এক অন্য রকম স্মৃতি।
কথাগুলো বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলী। বাবা মৃত জিন্দার খান। মাতা মাজেদা খাতুন (আমিরুননেছা)। আদি নিবাস গোপালগঞ্জ জেলা সদরের কাঠি গ্রামে। গেজেট নং ৫৫৯। বর্তমানে খুলনা মহানগরীর টুটপাড়া এলাকায় সপরিবারে ছোট্ট ভাড়াবাড়িতে থাকেন। তিনি বলছিলেন, আমরাতো এখন বেঁচে আছি বোনাস হিসেবে। সেই দিনতো আমরা মরণের শপথ নিয়ে মাঠে নেমেছিলাম। আমি ছিলাম যশোর ইপিআর’র সিভিল বাবুর্চী। সকলকে অস্ত্র তুলে দেওয়ার পর যশোরের চাঁচড়ার মোড়ে গিয়ে তিনদিন তিনরাত যুদ্ধ করলাম। সেখানে সবাইকে শুধুমাত্র ডাবের পানি খাওয়ালাম। এরপর বেনাপোল বর্ডারে গিয়ে হাজির হলাম। সেখান থেকে খাদ্য খাবার নিয়ে যশোর সেনানিবাস ঘেরাও করে রাখলাম। যশোরে মহড়া দিয়ে মণিহারের সামনে এসে দেখি অনেক লোক দাঁড়ানো। তারা নড়াইল ঘাটে যাবে। আমার নেতৃত্বে একটি ট্রাক দাঁড় করালাম। সেই ট্রাকে করে কয়েক দফায় বহুলোক পাঠালাম নড়াইল ঘাটে। পরে আমরা যশোর, লোহাগড়া, ভাইটে পাড়া, আলফাডাঙ্গা, ফরিদপুর গেলাম। সেখানে গেলে বিহারীরা আমাদের ওপর থেকে বোমা মারল। ভাঙচুর করলো। আমরা সেখান থেকে চুয়াডাঙ্গা হয়ে ভারতের বনগাঁ স্কুল মাঠে গেলাম। সেখান থেকে আমাদের পাঠনো হলো ৯নং সেক্টরে। আমাদের সাথে ছিলেন কমান্ড অফিসার শফিউল্লাহ, মাহবুব ও ওসমান।
বনগাঁ স্কুল মাঠ থেকে আমাদেরকে পাঠানো হল ভোমরা চেকপোস্ট এলাকায়। সেখানে ৭ মাস তুমুল যুদ্ধ করলাম। খানেরা একটা গুলি করলে আমরা করি ১শ’টা। ভোমরা চেকপোস্ট এর পাশে ইস্ট ইন্ডিয়ার ঘাট আছে। সেখানে মারা যায় আমাদের এক সাথী। তার দাফন করি ওখানে। এরপর সাতক্ষীরার বাকালে পৌঁছলাম। পাক সেনারা খবর পেয়ে বাকাল ব্রিজ মিসাইল মেরে উড়িয়ে দেয়। আমরা বাকাল স্কুলে গিয়ে দেখি পাকসেনারা অনেক খাবার-দাবার রেখে পালিয়ে গেছে। আমি আমার কমান্ড অফিসারকে বললাম। আমরা কি এ খাবার নেব। তিনি বললেন, না। কারণ তারা এ খাবারে বিষাক্ত কিছু মিশিয়ে রাখতে পারে।
সেখান থেকে আমরা কেশবপুর গেলাম। কেশবপুর এলাকার চেয়ারম্যান আমাদেরকে দুটো গরু দিল। এইদিন আমরা সবাই মিলে খুব তৃপ্তি সহকারে খেলাম। এরপর গেলাম মণিরামপুর। সেখানে গিয়ে আমি আউট পাস নিয়ে বাড়ি গেলাম। বাড়ি গিয়ে আবারো মায়ের পায়ের ধূলা নিয়ে ক্যাম্পে ফিরে আসলাম। আমার ওস্তাদ ছিলেন মোনায়েম খানের বডিগার্ড ফসিউল্লাহ। যুদ্ধ শেষ হলো। আমরা জয়ী হলাম। আমাকে পাঠানো হলো যশোর ইপিআরে (বিডিআর) চাকরি দিয়ে। কোন বেতন কড়ি নেই। পরে আমি বাড়ি ফিরে দেখি আমার ছোট ভাই বোনদের গায়ে বসন্ত উঠেছে। আমি আর ব্যারাকে ফিরে গেলাম না। মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলী আক্ষেপ করে বলেন, তারা যুদ্ধ করেছিলেন দেশ স্বাধীন করবেন বলে। দেশ স্বাধীনও হয়েছে, কিন্তু বাংলার মানুষ আজো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আজ কেউ কিছু টাকা নিয়ে রাস্তায় গেলে তাকে মেরে ফেলে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এজন্য কি মরণের শপথ নিয়ে তারা যুদ্ধ করেছিলেন- মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে এ প্রশ্ন রেখেছেন তিনি গোটা জাতির কাছে।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top