‘পাক হেলিকপ্টার’ ধ্বংস না করার স্মৃতি কষ্ট দেয় নির্মল অধিকারীকে

‘পাক হেলিকপ্টার’ ধ্বংস না করার স্মৃতি কষ্ট দেয় নির্মল অধিকারীকে

স্টাফ রিপোর্টার
’৭১ এর নভেম্বর মাস। রাজাকার প্রধান রজব আলীর সেকেন্ড ইন কমান্ড হাদি মল্লিক ধরা পড়েছে মুক্তিবাহিনীর হাতে। তাকে ছাড়িয়ে নিতে স্থানীয় রাজাকারদের দু’টি দল পরপর হামলা করে মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পে। কিন্তু বাধার মুখে টিকতে না পেরে তারা ফিরে যায়। কিন্তু একদিন পরেই মোংলা থেকে পাক সেনাবাহিনী গানবোটে করে হাজির হয় ক্যাম্পের আধামাইল দূরে। তাদের মর্টার সেলের আঘাতে মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে আশেপাশের গ্রাম। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি চালায় পাক সেনাদের লক্ষ্য করে। এরই মধ্যে গানবোট থেকে নেমে পাক সেনারা ক্রল করে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু বৃষ্টি ও পেড়ি কাদায় সুবিধা করতে না পেরে ফিরে যায় দলটি।
একাত্তরের রণাঙ্গনের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে সেদিনকার ঘটনা প্রবাহ এমনিভাবেই বর্ণনা করছিলেন মুক্তিযোদ্ধা নির্মল চন্দ্র অধিকারী। তার বাড়ি খুলনার বটিয়াঘাটার চক্রাখালি গ্রামে। বললেন, রামপাল কালেখাঁর বেড় ক্যাম্পে সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে পাকসেনাদের মোকাবেলা করেছিলেন। একপর্যায়ে পাকসেনারা পিছু হটলেও বিমান আক্রমণের কথা বাতাসে ভাসছিল। ক্যাপ্টেন আফজাল প্রায় একশ’ সহযোগী নিয়ে ক্যাম্পের জায়গা বদলের চিন্তা করছিলেন। এরই মধ্যে পাকসেনাদের হেলিকপ্টার ওই জায়গায় রেকি (সরেজমিন) করতে আসে। হেলিকপ্টারটি নারকেল গাছের পাশ দিয়ে নির্মল অধিকারীর একেবারে মাথার ওপর চলে আসে। হাতের বন্দুক আগে থেকেই নিশানা করা ছিল। ট্রিগার চাপতে যাবেন তখনই বাধা দেয় ক্যাপ্টেন আফজাল। বললেন, হেলিকপ্টারটি বিস্ফোরিত হলে আশেপাশের সব গ্রাম জ্বালিয়ে দিতো ক্ষিপ্ত পাক সেনারা। সবার সাথে আমাদেরও মরতে হতো। ওই সময় ক্যাপ্টেনের কথা বাস্তবসম্মতই মনে হয়েছিল। কারণ, অনিশ্চিত যুদ্ধ তখনোও অনেক বাকি। তবে এই স্মৃতি আজো পীড়া দেয় নির্মল অধিকারীকে। বললেন, ওইদিন হেলিকপ্টারটি বিস্ফোরিত করতে পারলে ইতিহাসে নাম লেখা থাকতো তার।
এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নির্মল অধিকারী বললেন, এরপর মুক্তিযোদ্ধার এই দলটি বাগেরহাটের ফকিরহাট চুলকাঠি এলে রাজাকাররা চারদিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলে। তাদের সাথে যোগ দিতে রওনা হয় পাক সেনাদের বড় একটি দল। বিপদ টের পেয়ে ক্যাপ্টেন আফজালের নির্দেশে মাত্র ২০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সেখানে রেখে ছোট ছোট দলে অন্যরা পিছু হটে। এখানে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে প্রায় ১৩০ জনের এই মুক্তিযোদ্ধা দলটি।
নির্মল অধিকারীসহ ১২ জনের একটি ছোট দল আঠারবেঁকি নদী হয়ে তেরখাদা ও গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী পর্যন্ত চলে যায়। এখানে অস্ত্র গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে ও সেই সাথে সহযোদ্ধা কমে এলে তারা আবারো ভারতে ফিরে যান। ততদিনে বাংলাদেশকে স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়েছে ভারত। বেগুনদিয়া ক্যাম্প থেকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষিত নতুন একটি দলসহ নির্মল অধিকারী সীমানা পেরিয়ে ডুমুরিয়ার শোভনা খেয়াঘাটে উপস্থিত হন। এখানে ২০ জন রাজাকার অস্ত্রসহ তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তাদেরকে চুকনগর ক্যাম্পে হস্তান্তর করে সামনে অগ্রসর এই বাহিনী। ডিসেম্বরের ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর তারা গল্লামারী রেডিও সেন্টারের কাছে ছোট ছোট যুদ্ধে অংশ নেয়।
জানা গেছে, নির্মল অধিকারী ছিলেন বাবা-মার একমাত্র সন্তান। যুদ্ধের সময় তার বয়স ১৮ থেকে ২০ বছর। ১৯৬৮ সালে সিটি কলেজে পড়াকালীন সময়ে তিনি ছাত্রলীগে যোগ দেন। ১৯৭১ এ যুদ্ধ শুরু হলে পাক সেনারা বটিয়াঘাটার জলমা চক্রাখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইপিআর বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। কাজিবাছা নদীতে গানবোট থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ও সেল মারা হয়। এরপর গ্রামে নেমে পাকসেনারা বাড়িতে বাড়িতে আগুন দেয়। ওই সময় নির্মল অধিকারী আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের সাথে ভারতের চব্বিশ পরগণার বসিরহাট টাকি ক্যাম্পে চলে যান। সেখান থেকে বেগুনদিয়া ক্যাম্পে ভর্তি হয়ে যুদ্ধে প্রশিক্ষণ নেন। চাকুলিয়া বিহার প্রদেশে উচ্চতর ট্রেনিং হয় ২১ দিনের। এরপর বেগনুদিয়া ক্যাম্প থেকে অস্ত্র নিয়ে ভারতের হাসনাবাদ দিয়ে সাতক্ষীরা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। প্রথমদিকে প্রায় দেড়শ’ জনের এই দলটির নেতৃত্বে ছিলেন বটিয়াঘাটা বিরাটের ক্যাপ্টেন আফজাল হোসেন ও বাগেরহাটের লেফ. আনোয়ার হোসেন। দেশ স্বাধীন হলে নির্মল অধিকারী অর্থ মন্ত্রণালয়, এলজিইডি ও পিডব্লিউডিতে কর্মরত ছিলেন। বললেন, যে স্বপ্ন নিয়ে তারা যুদ্ধ করেছেন আজকের বাংলাদেশ সেখানে শুধু হতাশা যোগায়। ব্যাংক লুটপাট, হলমার্ক কেলেংকারী, চাঁদাবাজি, সামাজিক অবক্ষয় এই সমাজকে পেছনের দিকে নিয়ে যায়। সুযোগ পেলে ’৭১ এর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এই বীর যোদ্ধা।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top