ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি বিষয়ে খুলনার নাগরিক ভাবনা

ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি বিষয়ে খুলনার নাগরিক ভাবনা

চুক্তিতে দু’দেশের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হবে : কাজী আমিন
স্টাফ রিপোর্টার
খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি কাজী আমিনুল হক বলেছেন, ভারতের সঙ্গে কোনো দেশবিরোধী চুক্তি হবে না। এই চুক্তিতে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও সমৃদ্ধ হবে। এতে করে আমাদের মহাকাশ প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা, সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানাবিধ কল্যাণ সাধিত হবে। কেননা এটা সরকারি উচ্চ পর্যায়ের পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমঝোতার ভিত্তিতে হবে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার এই চুক্তিতে দু’দেশের মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে।
বুধবার দৈনিক প্রবাহকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। ভারত বাংলাদেশের বন্ধু প্রতিম রাষ্ট্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, দু’দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর পরস্পর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বিনিময়ের ফলে বাংলাদেশের বিজিবি আরও শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হবে। দুই পক্ষই তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট থাকবে। ফলে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়াটাও সঠিকভাবে হবে। অভ্যন্তরিণ অনেক সমস্যা এই চুক্তির ফলে সমাধান হবে। যা দীর্ঘদিন ধরে দু’দেশের মানুষেরই চাওয়া ছিল। আজ তা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিরক্ষা সমঝোতা নিয়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। পারস্পারিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে উভয় পক্ষ সমুদ্রগ্রামী জাহাজ ও উড়োজাহাজ সফর বিনিময়ের আয়োজন করবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় উভয় পক্ষ সমন্বিত টহল ও যৌথ মহড়া পরিচালনা করবে। ফলে দু’দেশই তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করে আরও সমৃদ্ধ হবে। যেহেতু ভারত আমাদের চেয়ে শক্তিশালী সুতরাং তাদের সামরিক জ্ঞান আমাদের জন্য খুবই জরুরি। শুধু তাই নয় স্থল ও সমুদ্র সীমান্তে দু’দেশের রক্ষীবাহিনী একত্রে কাজ করতে পারবে। চোরাচালান ও দস্যুতা প্রতিরোধে এই চুক্তি দু’দেশের জন্য একটি মাইল ফলক হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, নিজেদের দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে চুক্তির সাথে জড়িত নীতি নির্ধারকেরা অবশ্যই সতর্কতা অবলম্ব করবে। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা মাথায় রেখে তাদের যেমন সহযোগিতা করার প্রয়োজন আছে। তেমনি দেশের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি জনগণের প্রত্যাশার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
তিনি খুলনার সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বলেন, এই চুক্তিতে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং এই শিল্পের বিকাশে যৌথ উদ্যোগ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, মহাকাশ প্রযুক্তি, গবেষণা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে একে অন্যকে সহায়তার কথা বলা হয়েছে। তাই এই চুক্তি নিয়ে বিভ্রান্ত হবার কোন কারণ নেই। সব কিছুই জনগণের সামনে খোলসা করে দেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে দু’দেশেরই স্বার্থ জড়িত আছে। নিজেদের স্বার্থ ঠিক রেখে সকলের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নিরাপত্তার নামে দাসত্বের শৃঙ্খল : শফিকুল আলম মনা
স্টাফ রিপোর্টার
ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য বৈষম্য অনেক। চুক্তি হওয়ার পর দীর্ঘদিনেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। এরপর আবার নতুন করে সামরিক সমঝোতার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনা।
তিনি বলেন, ভারতের সাথে আমাদের অনেক অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। এসব বিষয়ে আগে চুক্তি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেটা না করে নিরাপত্তার নামে দাসত্বের বেড়াজালে আটকের ষড়যন্ত্র জনগণ মেনে নেবে না।
‘বাংলাদেশ-ভারত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখা’ নিয়ে দৈনিক প্রবাহের সাথে আলাপকালে বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনা এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের তিন দিকে ভারতের অবস্থান। কোন বিষয় নিয়ে সঙ্কট তৈরি হলে তাদের সাথে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাহলে আমাদের ওপর কেন এই চুক্তি জোর করে চাপিয়ে দিতে হবে, এটা সন্দেহজনক। তিনি বলেন, প্রতিবেশি দেশ হিসেবে আমরা তাদের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্বে সম্মান দেবো। আর তারা আমাদের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্বে সম্মান দেবে এটাই স্বাভাবিক। তাই সামরিক সমঝোতার নামে আসলে ভারতের সাথে কি চুক্তি হচ্ছে তা এ দেশের মানুষকে জানাতে চায়। তিনি বলেন, বার বার সময় নিয়েও ভারত তিস্তা চুক্তি করেনি। ফারাক্কা বাঁধের কারণে এ দেশের অসংখ্য নদ-নদী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাটির দেশে পলি পড়ে ভরাট হয়েছে খাল-বিল। তাই অন্য সবকিছুকে পেছনে রেখে তিস্তা ইস্যুকে প্রাধান্য দিতে হবে। দেশের স্বার্থবিরোধী কোন চুক্তি জনগণ মেনে নেবে না।

প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ভারত লাভবান হবে : শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন
স্টাফ রিপোর্টার
জাতীয় পার্টি-জেপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও খুলনা উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন বলেছেন, ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করা হলে ভারতই লাভবান হবে। তাতে বাংলাদেশের কোন লাভ নেই। বরং অর্থের বিনিময়ে ভারত আমাদের ওপর কিছু অস্ত্র চাপিয়ে দেবে।
৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং সমরাস্ত্র কেনার পরিকল্পনার বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন। বর্তমান সময়ে ভারতের সঙ্গে এ ধরণের চুক্তির খুব একটা প্রয়োজন আছে বলেও মনে করছেন না তিনি।
শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন মনে করেন, বাংলাদেশের ওপর কোন দেশের হামলার আশংকা নেই। তাহলে অস্ত্র কেনা এবং প্রতিরক্ষা চুক্তিরও প্রয়োজন নেই। তারপরও সরকার এ ধরণের চুক্তি করলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর যাতে কোন ধরণের নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, আমরা সাব-মেরিন যুগে প্রবেশ করেছি। কিন্তু ভারত আবার মায়ানমারের কাছে সাবমেরিন বিধ্বংসি টর্পেডো বিক্রি করছে। যাতে তারা আমাদের সাবমেরিন বিধ্বংস করতে পারে। চুক্তি হলে ভারত যেন মায়ানমারের কাছে সাবমেরিন বিধ্বংসি টর্পেডো বিক্রি না করে সে শর্ত থাকা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
তিস্তা চুক্তি হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন বলেন, তিস্তা চুক্তির বিষয়ে সরকারের উচিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। এছাড়া সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং ভারত থেকে অবৈধ পথে অস্ত্র এবং মাদক প্রবেশের বিষয়ে দু’ দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

আগে তিস্তা চুক্তি হওয়া প্রয়োজন : মিনা মিজান
স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির খুলনা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিনা মিজানুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের পারিপার্শ্বিক অবস্থানের কারণে সময়পযোগী আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সজ্জিত একটি সেনাবাহিনীর সব সময় প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পার্শ্ববর্তী কোন দেশের স্বার্থে একটি সামরিক চুক্তি হতে পারে, কিন্তু তা কখনই নিজেদের জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নয়। ভারত বাংলাদেশের সাথে আসন্ন সামরিক চুক্তির বিষয়ে দৈনিক প্রবাহের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, জনগণকে না জানিয়ে অন্ধকারে রেখে কোন সামরিক চুক্তি হওয়া উচিত নয়। কি চুক্তি হচ্ছে চুক্তির আগে জনগণকে জানাতে হবে।
মিনা মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের রাষ্ট্র আমাদের কাছে স্বাধীন ও মুক্ত। আমরা কোন দেশের ডাকে বিশেষ সুবিধা পেতে তড়িঘড়ি করে চুক্তির টেবিলে বসতে যাব কেন? ভারত বাংলাদেশের সাথে সামরিক চুক্তির বিষয়ে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, যে চুক্তি করিনা কেন তা জনগণকে জানানো হবে। তার এ কথার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, তা ঠিক না, চুক্তির আগে জনগণকে জানাতে হবে, জনগণের কাছে দেশের সরকার দায়বদ্ধ। সরকারের কাছে জনগণ কখনই দায়বদ্ধ নয়।
তিনি বলেন, ভারতের সাথে সামরিক চুক্তি হওয়ার আগে তিস্তা পানি চুক্তি হওয়া উচিত। তাদের কেন্দ্রের সরকার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দোহাই দিয়ে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে সময় ক্ষেপণ করছে। আর সামরিক চুক্তির সময় তড়িঘড়ি দেশের জনগণ ভাল চোখে দেখে না। একটা দেশের একটা অঞ্চল পানির অভাবে মরুপ্রবণ হয়ে যাবে সে বিষয় আগে ভাবা দরকার না সামরিক চুক্তি তার আগে করা দরকার- এটা আমাদের সরকারের বোধদয় হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের উচিত এমন চুক্তি ভারতের সাথে না করা যা ক্ষতিকর হবে। আমরা এটাও আশা করি দেশের স্বার্থে জনগণের সেন্টিমেন্টের কথা বিবেচনা করে এমন কিছু না করা যাতে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি যায়।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top