ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি বিষয়ে খুলনার নাগরিক ভাবনা

ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি বিষয়ে খুলনার নাগরিক ভাবনা

প্রতিরক্ষা চুক্তি সন্ত্রাস ও জঙ্গী দমনে ভূমিকা রাখবে : তালুকদার খালেক
স্টাফ রিপোর্টার

প্রতিরক্ষা চুক্তির ফলে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস ও জঙ্গী দমনে বাংলাদেশ-ভারত এক সাথে কাজ করতে পারবে। দুই দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী এক সাথে কাজ করলে উভয় দেশই লাভবান হবে। সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই চুক্তি ভূমিকা রাখবে। ফলে দেশের স্বার্থেই এই চুক্তি করা হবে। আর তা দেশবাসী জানতেও পারবে। প্রতিটি বিদেশ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে ভাল মন্দ জানিয়ে দেন। এতে কৌতুহলী হওয়ার কিছু নেই।
দৈনিক প্রবাহকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আলহাজ তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি। তিনি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কোন চুক্তি করতে পারেন না। দেশের জন্য যা মঙ্গল তিনি তাই করবেন।
তিনি আরও বলেন, চুক্তির আগে নীতি নির্ধারণী মহলের বৈঠক হবে। সেখানে উভয় পক্ষের সমঝোতা ও বোঝাপড়া হওয়ার পরই সিদ্ধান্ত হবে। বলা মাত্রই কোন চুক্তি হয়ে যায় না। যেকোন চুক্তির আগেই সবধরণের সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। তাই যারা বিষয়টি নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে, তারা দেশের ভাল চায় না। সাময়িক গলাবাজি শেষ হলে জনগণই তাদের প্রতিহত করবে।
তিনি বলেন, দুই দেশের প্রতিরক্ষা খাতে প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন আছে। উভয় দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় হলে দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। চোরাচালান, সন্ত্রাস, জঙ্গী ও উগ্রবাদীদের দমন করা সহজ হবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র সীমানায় উভয় পক্ষ সমন্বিত টহল ও মহড়া পরিচালনা করতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।
চুক্তির গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা শিল্পে দু দেশের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা একসাথে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে। এই চুক্তি দুই দেশেরই ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও এক সাথে কাজ করার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে। যেহেতু ভারত আমাদের দেশের চেয়ে শক্তিশালি তাই তাদের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু জানার আছে। এই চুক্তি ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও উঁচু পর্যায়ে নিয়ে যাবে বলেও মনে করেন এই রাজনীতিবিদ।

প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আগে সীমান্ত হত্যা ও বাণিজ্যিক বৈষম্য দূর করতে হবে : মনি
স্টাফ রিপোর্টার

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনি বলেছেন, ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আগে সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪ নদীর পানি সঙ্কটের সমাধান ও বাণিজ্যিক বৈষম্য দূর করতে হবে।
তিনি বলেন, এটি একটি জাতীয় ইস্যু। শুধুমাত্র সরকারের বিষয় নয়। যে কারণে এ বিষয়ে চুক্তির আগে অবশ্যই বিষয়টি জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটি, রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি এবং পলিসি মেকারদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং সমরাস্ত্র কেনার পরিকল্পনার বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় প্রবাহকে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়োজিত কর্মকর্তারা কি করছেন, সেটি জানা যাচ্ছে না। ফলে নানা আশংকা তৈরি হচ্ছে।
সিটি মেয়র বলেন, আগে থেকেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা চুক্তি হয়ে আছে। ফলে নতুন করে আর প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রয়োজন নেই। এছাড়া ভৌগলিক অবস্থানগত দিক থেকে ভারত তিন দিকে অবস্থান করায় অন্যকোন দেশের পক্ষে আমাদের ওপর হামলার কোন আশংকাও নেই।
মনিরুজ্জামান মনি বলেন, তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪ নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে রেখেছে। ফলে আমাদের দেশের নদীগুলো মরে যাচ্ছে। মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। ফসল হচ্ছে না। অন্যদিকে, হাকালুকি বাঁওড়ে অতিরিক্ত পানি ঢুকিয়ে ফসল নষ্ট করছে। অথচ সরকারের সেদিকে নজর নেই। তারা ভারতের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে এবং তাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে আমাদের অধিকার বুঝে নেওয়ার বিষয়ে সরকারের বেশি উদ্যোগী হওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
ভারতের কাছ থেকে সমরাস্ত্র কেনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বিএনপি নেতা মনি বলেন, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ইংল্যান্ড-আমেরিকার অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে। সেখানে ভারতের অস্ত্র কতটুকু কার্যকর সেটি ভেবে দেখার বিষয়। তাদের অস্ত্রের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া তাদের দেওয়া ঋণের অর্থেই অস্ত্র কিনতে হবে। আর তারা লাভের অংশ নিশ্চিত করেই ঋণ দিচ্ছে। সামরিক খাতে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থও বিবেচনা করা উচিত। এ ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী ভারতের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার আশংকা প্রকাশ করে এ বিষয়ে খুব সাবধানে সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সামরিক সমঝোতা কৌশলগত পদক্ষেপ : আনোয়ারুল কাদির
স্টাফ রিপোর্টার

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির মনে করেন, ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা কূটনৈতিক কৌশলগত পদক্ষেপ। সম্প্রতি চায়না সরকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বড় ধরণের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার চুক্তি করেছে। এছাড়া সেনবাহিনীতে ব্যবহৃত ভারী অস্ত্র ও ছোট অস্ত্রের অধিকাংশই চায়নায় তৈরি। বাংলাদেশ যেন চায়নার দিকে একচেটিয়াভাবে ঝুঁকে না পড়ে এ কারণেই কৌশলগত এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
‘বাংলাদেশ-ভারত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখা’ নিয়ে দৈনিক প্রবাহকে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, ভারত যেসব অস্ত্র তৈরি করে তা রাশিয়ান ফর্মূলায় তৈরি। এসব অস্ত্র ক্রয়ে বাংলাদেশেকে রাজি করানোও এই সামরিক সমঝোতা স্মারকের একটি দিক।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিষয়গুলো খুবই স্পর্শকাতর ও ডিপ (গভীর) বিষয়। অনেক ভেবে-চিন্তে এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তিনি বলেন, সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সন্ত্রাসী কর্মকা- যৌথভাবে দমনের কথা বলা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ অবস্থানের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন রয়েছে। তবে চুক্তির ব্যত্যয় ঘটলে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা থাকে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে দীর্ঘদিনের দাবি তিস্তা চুক্তি করা সম্ভব হলে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ লাভবান হতো। তিস্তা ব্যারেজের ফলে বাংলাদেশের ভূ-উপরিভাগের পানি শুকিয়ে গেছে। ফলে এদেশের নদী নির্ভর কৃষি ও অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত পরিপন্থী কর্মকা- বন্ধ ও তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

প্রতিরক্ষা চুক্তির আগে বৈষম্য নীতি পরিহার জরুরি : লোকমান হাকিম
স্টাফ রিপোর্টার

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি ভাষা সৈনিক আলহাজ লোকমান হাকিম বলেন, ভারত বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র এটা ঠিক। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের অবদানও রয়েছে। কিন্তু তিস্তা চুক্তিসহ উজানে নদীগুলো বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। এ জন্য বন্ধু রাষ্ট্র ভারত সরকারের প্রতি দেশের জনগণের ঘৃণা আর বিদ্বেষ ক্রমে বাড়ছে ছাড়া কমছে না। এতে করে উভয় দেশের মধ্য বন্ধুত্ব সম্পর্কের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কষ্টকর। এ জন্য ভারত বাংলাদেশের মধ্যে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে সমরাস্ত্র সমঝোতা স্মারকের আগে বৈষম্যনীতি পরিহার চুক্তি করা দরকার।
আজ ৭ এপ্রিল চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ভারত থেকে প্রথমবারের মত ঋণচুক্তির আওতায় সমরাস্ত্র কেনাকাটার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক সই করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। সমঝোতা স্মারকটি সই হলে ভারত থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা (৫০ কোটি ডলার) সমমূল্যের সমরাস্ত্র কিনবে বাংলাদেশ।
এসব বিষয়ে গত ৫ এপ্রিল নগরীর খালিশপুর পাওয়ার হাউজগেটস্থ বাসভবনে একান্ত সাক্ষাৎকারে আলহাজ লোকমান হাকিম এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, দেশের তিন দিক ভারত দিয়ে ঘেরা আর এক দিক নদী। এক কথায় ভারত রাষ্ট্র দিয়ে ছোট্ট বাংলাদেশ ঘেরা। এদেশে সমরাস্ত্র মজুদে প্রথম হওয়ার আগে ভারতের সাথে চলমান চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন জরুরি। যেমন-ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা চুক্তিসহ আরো অনেকগুলো চলমান চুক্তি বাস্তবায়ন হওয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যেমন অস্ত্রের প্রয়োজন আছে, পাশাপাশি জীবন জীবিকা ও স্বাধীনতার মূল চেতনা অর্থনৈতিক মুক্তি এ দেশের নাগরিকদের সর্বাগ্রে প্রয়োজন। সেদিকেই সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top