হিজড়াদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক প্রশিক্ষণ

হিজড়াদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক প্রশিক্ষণ

খলিলুর রহমান সুমন
অবহেলিত জনগোষ্ঠী হিজড়া সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নানা ধরণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে হিজড়াদের আবাসন সমস্যা অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবাসন সমস্যা সমাধান ও কাজের নিশ্চয়তাই তাদেরকে সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসার সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে হিজড়ারা মনে করেন। এ জন্য তারা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কর্মের ও আবাসন ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানান।
খুলনা সমাজ সেবা অফিসের হিসেব মতে, খুলনার ৯টি উপজেলা ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের এলাকায় ২২০ জন হিজড়া রয়েছে। বয়স্ক বা বিশেষ ভাতা দেওয়া হচ্ছে ১৬ জনকে। দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছর পর্যন্ত বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ পনের লাখ পাঁচ হাজার পাঁচশত পঞ্চাশ টাকা। দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক প্রশিক্ষণ কাজে চলমান ব্যয় হয়েছে বারো লাখ তেইশ হাজার চারশত ছত্রিশ টাকা। চলমান প্রকল্পসমূহ ও তার উদ্দেশ্য হচ্ছে স্কুলগামী হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৪ স্তরে (প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচচ মাধ্যমিক এবং উচচতর স্তর) উপবৃত্তি প্রদান। ৫০ বছর বা তদুধর্ক্ষ বয়সের অক্ষত ও অস্বচ্ছল হিজড়াদের বয়স্ক বা বিশেষ ভাতা মাসিক হিসাবে প্রদান। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম হিজড়া জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করে তাদের সমাজের মূল ¯্রােতধারায় আনয়ন।
হিজড়া সম্প্রদায়ের খালিশপুর অঞ্চলের চায়না হিজড়া বলেন, বর্তমান সরকার তাদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সামাজিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। অন্যান্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার কাজ করছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, সরকারের এ মহতি উদ্যোগ সবই ভেস্তে যাচ্ছে। আলোর মুখ দেখছে না। এ জন্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দরকার কাজ ও আবাসনের ব্যবস্থা। ইতোমধ্যে তিনিসহ তার সহকর্মীরা হাঁস মুরগি পালন, গবাদি পশু পালন, সেলাই প্রশিক্ষণসহ নানা ধরণের আয়বর্ধনমুখী প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। তবে তা বাস্তবায়ন করতে পারলে হিজড়ারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। তিনি বলেন, তিনি খালিশপুর কাশিপুর রেললাইনের পাশে সরকারি জায়গায় ছোট একটি ঘর করে বসবাস করছেন। যে কোন সময় রেল কর্তৃপক্ষ এসে তার ঘর উচ্ছেদ করে দিতে পারে। তখন তিনি ভাসমান মানুষ হয়ে যাবেন। তার অধীনে ২৪ জন হিজড়া রয়েছে। এছাড়া খালিশপুর, দৌলতপুর মিলিয়ে এক থেকে দেড়শ’ হিজড়া রয়েছে। এছাড়া খুলনা নগরীতে আরো হিজড়া রয়েছে। তিনি বলেন, হিজড়ারা মা-বাবা সংসার ছেড়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। কয়েকজন হিজড়া এক হয়ে রেল লাইনের পাশে, ফুটপাতে অথবা বাসা ভাড়া নিয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করে। এতে করে তারা প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগাতে পারছেন না। এ জন্য দরকার স্থায়ী ঘর-বাড়ি। এ জন্য তিনি খুলনায় হিজড়াদের পুনর্বাসনে হিজড়া পল্লী গড়ে তোলার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
বয়রা এলাকার শিমলা হিজড়া জানান, তিনি শিশু নাচাতে বা বাজারে তোলা তুলতে চান না। এটা এখন সমাজ সহজভাবে মেনে নিচ্ছে না। এটা অসম্মানের কাজ বটে। তবে তাদের সরকার চাকরি ও থাকার জায়গা দিলে তারা এসব ছেড়ে দিয়ে সমাজের খেটে খাওয়া মানুষের মত তারাও খেটে খাবে। তিনি বলেন, হিজড়াদের পুনর্বাসনের ভুল খবরটা যত দ্রুত সাধারণ মানুষের মাঝে পৌঁছেছে। তত ধীরে হিজড়াদের অধিকার বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ জন্য সরকারসহ প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে অবহেলিত এ হিজড়ারা সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
খুলনা নগরীর দৌলতপুর থানাধীন মহেশ্বরপাশা ছোটমনি নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক কাজী মোঃ ইব্রাহীম বলেন, ২০১২ সালে সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম বারের মত খুলনায় হিজড়াদের হাতে কলমে ৫০ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে ৩০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পবিত্র রমজান মাসের রোজার আগে ও পরে এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। খালিশপুর কেএমএসএস ট্রেনিং সেন্টারে এ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়। প্রথম দফায় সাত দিন প্রশিক্ষণে মনো সামজিক কাউন্সিল করা হয়। দ্বিতীয় দফায় আটত্রিশ দিন বিভিন্ন কর্মদক্ষতার জন্য প্রশিক্ষণ এবং শেষ দফায় পাঁচ দিন প্রশিক্ষণের পুনরাবৃত্তি করা হয়। স্থানীয় মসজিদের এক ইমামকে দিয়ে ধর্মীয় আলোচনা সাপেক্ষে তাদের প্রশিক্ষণে মনোযোগী করা হয়। তিনি বলেন, হিজড়াদের প্রশিক্ষণ লব্ধ জ্ঞান কাজে লাগাতে হলে তাদের আগে স্থায়ী বাড়ি থাকা জরুরি।
খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মিজানুর রহমান মিজান গত ৭ মে খুলনায় অনুষ্ঠিত হিজড়াদের এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিজড়াদের নিজের মানুষ মনে করে তাদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য তাদেরকে উন্নত জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। সেসব পরিকল্পনা থেকে খুলনাঞ্চলে যা যা করার দরকার তা ধারাবাহিকভাবে করা হবে। এদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আলাদা জমি, আলাদা বাড়ি, আলাদা গোরস্থানসহ যা যা প্রয়োজন তা ধারাবাহিকভাবে করা হবে বলে আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, সমাজে হিজড়ারা সারাজীবন অবহেলিত। এ সম্প্রদায়ের সদস্যদের মাঝে ভাল গুণাবলী সম্পন্ন কর্মী রয়েছে। তারা যাতে ভাল থাকে সে ব্যাপারে প্রশাসনকে বলা হয়েছে। তাদেরকে সরকারিভাবে জমি দেওয়া হবে। তবে পুনর্বাসনের জন্য সমাজের সকল স্তরের মানুষের সহযোগিতা লাগবে বলে এ নেতা মনে করেন।
খুলনা অঞ্চলের পান্না হিজড়া বলেন, ইতোমধ্যে তারা সরকারি বেসরকারিভাবে নানা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। গবাদিপশু পালনের প্রশিক্ষণের পর তা বাস্তবায়ন করতে হলে দরকার স্থায়ী ঘরবাড়ি। তাতো হিজড়াদের নেই। তাই এ প্রশিক্ষণ তাদের কোন কাজে আসছে না। কারণ তারা ভাসমান ও ভাড়া বাড়িতে থাকেন। সরকারি খাস জমি আছে অনেক। তাদের পুনর্বাসনের জন্য ওসব খাস জমিতে হিজড়া পল্লী গড়ে তোলার জন্য তিনি জেলা প্রশাসকের নিকট জোর দাবি জানান।
হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নে কাজ করছে খুলনার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ছিন্নমূল মানব কল্যাণ সোসাইটি খুলনা। এ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন বলেন, সরকার হিজড়া (ট্রান্সজেন্ডার) জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ব্যাপকভাবে কাজ করছে। তবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাদের অগ্রগতি সেভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে না। একই সাথে ভাসমান এ জনগোষ্ঠীর হিজড়া পল্লী থাকা জরুরি। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এ ব্যক্তি।
জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান বলেন, হিজড়ারা জন্মের পর থেকে অবহেলিত ও বঞ্চিত। তাদের সামাজিক অধিকারসহ সকল অধিকার ফিরিয়ে দিতে সরকার কাজ করছে। তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সে পদক্ষেপগুলো একদিনে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এগুলো বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা হচ্ছে। হিজড়াদের প্রশিক্ষণ তারই অংশ। তিনি বলেন, হিজড়ারা যা শিখবে তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করবে। তিনি হিজড়াদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
খুলনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সুকান্ত কুমার সরকার বলেন, হিজড়ারা অবহেলিত ও অসম্মানীত একটি জনগোষ্ঠী। সরকারের পক্ষ থেকে হিজড়া সম্প্রদায়কে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার আয়বর্ধক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হিজড়ারা যদি আয় করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতের সাথে মিশতে পারে তার জন্য সরকার কাজ করছে। এ জন্য সংস্থার পক্ষ থেকে হিজড়াদের আয়বর্ধক নানা ধরণের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৮০ জন হিজড়াকে প্রতিমাসে ৩শ’ টাকা করে ভাতা দেওয়া কার্যক্রম চলমান বলে তিনি জানান।
হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নে কাজ করছে খুলনার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রূপসা। এ সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক হিরন্ময় মণ্ডল বলেন, হিজড়াদের নানা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এ জন্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হিজড়াদের সক্ষমতা অর্জন ও দক্ষতা বৃদ্ধি করাই মূল উদ্দেশ্য। তবে তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও সরকারের মাথায় রাখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top