মুন্নার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে কি?

মুন্নার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে কি?

আসাফুর রহমান কাজল
মাহফুজুর রহমান মুন্না। বয়স ১১ বছর। বড় হওয়ার স্বপ্ন। খুলনার সরকারি স্কুলে ভর্তির সাধ। কিন্তু সে স্বপ্ন পূরণ হবে কি? সেপ্টেম্বর ২০১৪। সরকারি স্কুলে ভর্তির প্রস্তুতি চলছে। দিনটি ছিল ১৩ সেপ্টেম্বর। সকালে বাথরুমে গিয়ে পড়ে যায় মুন্না। আর উঠতে পারে না। কোন মতে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসে। দ্রুত নেওয়া হয় খুলনা শিশু হাসপাতালে। দ্বিতীয় দিন তাকে রেফার্ড করা হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাকে রাখা হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। এর মধ্যে ১৪ দিন তাকে রাখা হয় লাইফ সাপোর্টে। চিকিৎসকরা যে রোগটির নাম ছাড়পত্রে উল্লেখ করেছেন সেটি হচ্ছে জিবিএস (গুলেন বারি সিনড্রম)।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ২০১৪ সালের ৩ ডিসেম্বর রোগীটি রেফার্ড করা হয় ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালে। ৪ ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকরাই ভারতের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে আলাপ করেন। মুন্নার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে পরিবারের পক্ষ থেকে ভারতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু বিএসএমএমইউ’র চিকিৎসকরা তাকে ভারতে নিতে দেন না। নিজেরাই পরীক্ষামূলকভাবে অপারেশন করেন। অপারেশনের এক সপ্তাহ পর তারা বলেন, অপারেশন সাকসেস হয়নি। তখন রোগীর পরিবারে নেমে আসে চরম হতাশা। সেখান থেকেই মুন্নার গলায় প্লাস্টিকের ট্রাকিও স্টমি (শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার প্লাস্টিকের বিশেষ যন্ত্র) সেট করে দেয়। নাকে নল দেওয়া হয়েছে খাবার খাওয়ার বিকল্প পথ হিসেবে। বিএসএমএমইউ থেকে গত বছর ৭ মার্চ ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও মুন্নাকে বাঁচতে হচ্ছে নাকের নল দিয়ে তরল খাবার খেয়ে। এভাবে চলছে আড়াই বছর।
থেমে নেই মুন্নার পড়ালেখা। নগরীর গগণ বাবু রোডস্থ খানজাহান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র এখন।
খানজাহান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রশান্ত রায় জানান, মুন্না যথেষ্ট মেধাবী ছাত্র। তার হাতের লেখা অনেক সুন্দর। অসুস্থ হওয়ায় পড়ালেখা বন্ধ ছিল তার। এখন সে শব্দ করে পড়তে পারেনা। কিন্তু তার রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে না। পড়ালেখার প্রতি তার যথেষ্ট আগ্রহ।
উল্লেখ্য যে, স্কুলটিতে টিআইবি-সনাকের পাইলটভিত্তিক কাজ চলছে। সেই সুবাদে স্কুলে অনুষ্ঠিত মা সমাবেশ থেকে টিআইবি-সনাকের নজরে আসে মুন্না। এরপর থেকেই মানবিক কারণে ছেলেটির সাহায্যার্থে এগিয়ে আসে টিআইবি-সনাক খুলনা।
মুন্নার বাবা মোঃ মোস্তফা কামাল একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র পুত্র সন্তানের চিকিৎসায় ইতোমধ্যে খরচ করেছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। ভারত বা অন্য কোন দেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করাতে এখনো দরকার আরো ১০ লাখ টাকা। যা জোগাড় করা মুন্নার বাবার পক্ষে সম্ভব না। সে জন্যই আজ সন্তানকে নিয়ে সকলের কাছে জানাচ্ছে সাহায্যের আবেদন।
মোঃ মোস্তফা কামাল ছেলের সম্পর্কে কথা বলছিলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এবং কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে। তিনি বলছিলেন, ‘সবচেয়ে কষ্ট লাগে তখনই, যখন আমরা মাছ-মাংস খাই আর ছেলেটি ফ্যাল ফ্যাল করে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমাদের মুখে আর খাবার ওঠে না। শক্ত জাতীয় খাবার খেতে পারে না। তারপরও আমাদের সাথে বসে খাবার চিবিয়ে চিবিয়ে ফেলে দেয়। মুখ দিয়ে খাবার গিলতে পারে না। এমন কষ্ট আর কতদিন দেখতে হবে জানিনা’।
গলায় ট্রাকিও স্টমি’র মুখে হাতের আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে ফিস ফিস করে মুন্না জানায় ‘সবাই যখন কোন খাবার খায় তখন আমারও খেতে ইচ্ছা করে, কিন্তু আমি পারি না’।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), খুলনার সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, ডাক্তারদের রেফার্ডের মধ্যদিয়ে একটি কোমলমতি শিশুর ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকারাচ্ছন্ন। প্রথম দিকেই ছেলেটিকে ভারতে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হলে আজ হয়ত এমন দুরাবস্থার মধ্যে পড়তে হতো না এই ছেলের বা তার পরিবারের। সবকিছু হারিয়ে এখন যে ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে তেমন সংগতিও নেই মুন্নার পরিবারের। যা ছিল তাতো এরইমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এজন্য তিনি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানান মুন্নার চিকিৎসার জন্য।
মুন্নার চিকিৎসার জন্য সাহায্য পাঠানোর জন্য তার পিতার নামে সোনালী ব্যাংকের খুলনা কর্পোরেট শাখায় একটি সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর খোলা হয়েছে। মোঃ মোস্তফা কামাল, সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর-০২৭১৫৩৪২০৬৫০৬। ব্যক্তিগত যোগাযোগ করা যেতে পারে মুন্নার পিতার সাথে ০১৭২০-৫১২১১৩।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top