খুলনা-যশোরের ৭ পাটকলে দেড়শ’ কোটি টাকার পণ্য অবিক্রিত

খুলনা-যশোরের ৭ পাটকলে দেড়শ’ কোটি টাকার পণ্য অবিক্রিত

খলিলুর রহমান সুমন
খুলনা-যশোর অঞ্চলের বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (বিজেএমসি) নিয়ন্ত্রিত সাতটি পাটকলে উৎপাদিত প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তবে শ্রমিক ও নাগরিক নেতারা এ জন্য বিজেএমসির অদক্ষতাকে দায়ী করেছেন। তারা বলেছেন, সরকারি পাটকলকে লোকসানী প্রতিষ্ঠানের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে বিজেএমসিকে ভেঙে দিতে হবে।
ক্রিসেন্ট জুট মিলের প্রকল্প প্রধান এ কে হাজারী বলেন, তার মিল উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পারায় আর্থিক সঙ্কটে ভুগছেন। সরকার পাটপণ্য ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা করছে। এছাড়া বিদেশে রপ্তানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার মিলে প্রায় ৪০ কোটি টাকার উৎপাদিত পণ্য মজুদ রয়েছে। এগুলো বিক্রি করতে পারলে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি দেওয়া কোন সমস্যাই ছিল না বলে তিনি মনে করেন।
স্টার জুট মিলের প্রকল্প প্রধান সুভেন্দ্র কুমার ঘোষ জানান, তার মিলে প্রায় ২৬ কোটি টাকার উৎপাদিত পণ্য অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে। গোডাউন ভরে এখন উৎপাদিত পণ্য ফ্লোরে রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিক্রি না হওয়ার পেছনে দু’টি কারণ। তা হচ্ছে- বিজেএমসির মার্কেটিং বিভাগ বিদেশি বায়ার সৃষ্টি করতে পারছে না আর অপরটি হচ্ছে এখন ডাল সিজন। বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পাটকলের উৎপাদিত পণ্য বেচাবিক্রি মন্দাভাব থাকে। তবে জুন মাসের পর থেকে আবার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি শুরু হবে বলে তিনি মনে করেন।
ইস্টার্ন জুট মিলের হিসাব ও অর্থ বিভাগীয় প্রধান প্রশান্ত কুমার নন্দী বলেন, তাদের মিলে প্রায় ৬ কোটি টাকার উৎপাদিত পণ্য অবিক্রিত অবস্থায় গুদামে পড়ে রয়েছে। পাটপণ্যের চাহিদা এখন কম বলে তা বিক্রি হচ্ছে না। এছাড়া ভারতে রপ্তানি করতে হলে ভ্যাটের বিষয়টি জোরদার করায় উৎপাদিত পণ্য ভারতে রপ্তানি করা যাচ্ছে না।
যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ (জেজেআই) প্রকল্প প্রধান আহসান কবির জানান, তার মিলে অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে প্রায় ১৮ কোটি টাকার উৎপাদিত পাটপণ্য। বকেয়া মজুরি দিতে না পারায় শ্রমিকদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। ভারতীয় বাজারে পাট পণ্য রপ্তানিতে ভ্যাট জটিলতার কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
কার্পেটিং জুট মিলের প্রকল্প প্রধান বনিজ উদ্দিন মিয়া জানান, তার মিলে সাপ্তাহিক মজুরি বকেয়া রয়েছে তিনটি। তবে উৎপাদিত পণ্য মজুদ রয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকার। প্লাটিনাম মিলের ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প প্রধান তোফায়েল আহমেদ বলেন, তার মিলে উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ কোটি টাকার। যা দিয়ে ৩০ সপ্তাহের মজুরি দেওয়া সম্ভব বলে তিনি জানান। তিনি জানান, বিশ্ব পাটের বাজারে এখন মন্দাভাব। এছাড়া ভারতে রপ্তানির ক্ষেত্রে ওই দেশের সরকার নতুন করে করারোপ করায় ব্যবসায়ীরা পাটপণ্য ক্রয় করতে নিরুৎসাহী হচ্ছে। এ নিয়মটা এবছরই চালু হয়েছে। এ নিয়মের কারণে পাট ব্যবসায়ীরা মিলের পাটপণ্য ক্রয় করার ঝুঁকি নিতে নারাজ। বায়ার পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ছে।
আলিম জুট মিলের প্রকল্প প্রধান প্রকৌশলী মারুফ হোসেন বলেন, তার মিলে প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের উৎপাদিত পণ্য মজুদ রয়েছে।
ক্রিসেন্ট জুট মিলের সিবিএ সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন বলেন, উৎপাদিত পাটপণ্য রপ্তানি করার ক্ষেত্রে বিজেএমসি অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। তারা বিদেশের মার্কেট ধরে রাখতে পারছে না। এ জন্য প্রতিটি মিলে কোটি কোটি টাকার উৎপাদিত পাটপণ্য গোডাউনে মজুদ পড়ে রয়েছে। তবে বিজেএমসিকে লোকসানী প্রতিষ্ঠান থেকে বাঁচাতে হলে আগে মাথাভারী প্রশাসন কমাতে হবে। বিজেএমসিকে ভেঙে তিনটি জোনে ভাগ করতে হবে। তবে এ শিল্প লাভের মুখ দেখতে পারবে বলে তিনি মনে করেন।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ভাষা সৈনিক আলহাজ লোকমান হাকিম বলেন, সরকার বিজেএমসিতে কয়েকজন অদক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে রেখেছে। তারা উৎপাদিত পাটপণ্য বিক্রির জন্য বিদেশে বাজার সৃষ্টি করতে পারছে না। এ জন্য পাটশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকার এসব ব্যর্থ কর্মকর্তাদের লাখ লাখ টাকা বেতন দিয়ে রেখেছে পাটশিল্পকে রক্ষা করতে। তারা উল্টো করছে। পাটপণ্যের বাজার সৃষ্টিতে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জোর দাবি জানান এ নাগরিক নেতা।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top