পাটকল শ্রমিকদের জনসভায় রেলপথ-রাজপথ অবরোধসহ ১০ দিনের কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা

পাটকল শ্রমিকদের জনসভায় রেলপথ-রাজপথ অবরোধসহ ১০ দিনের কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা

পাট প্রতিমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ

এস লিয়াকত হোসেন
শ্রমিকদের ১১ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য রেলপথ-রাজপথ অবরোধ করার হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করলেন জনসভায় নেতৃবৃন্দ। বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের অপসারণ ও তার কুশপুত্তলিকা দাহের মাধ্যমে গতকাল খালিশপুরের জনসভায় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের ১১ দফা বাস্তবায়নের দ্বিতীয় দফার আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করলেন শ্রমিক নেতারা।
পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচির শুক্রবার বেলা ৩টায় খালিশপুর পিপলস গোলচত্বরে শ্রমিক জনসভার আয়োজন করে বাংলাদেশ পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদ। জনসভার শুরুতে জেজেআই, ইস্টার্ন, আলিম, ক্রিসেন্ট, স্টার, প্লাটিনাম, দৌলতপুর ও খালিশপুর জুট মিলের শ্রমিকরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জনসভায় যোগ দেয়। মিছিলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পাট প্রতিমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর শ্রমিক জনসভাটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। শ্রমিক নেতারা মঞ্চে ওঠার সাথে সাথে উপস্থিত হাজার হাজার শ্রমিক বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে নেতাদের কর্মসূচি ঘোষণা করার দাবি জানান।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন স্টার জুট মিল সিবিএর সাধারণ সম্পাদক মোঃ আঃ মান্নান। সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন বাংলাদেশ পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদের কেন্দ্রীয় আহবায়ক খুলনা প্লাটিনাম জুট মিল এমপ্লয়ীজ ইউনিয়নের সভাপতি সরদার মোতাহার উদ্দিন। জনসভায় বক্তৃতা করেন পরিষদের কার্যকরী আহবায়ক ক্রিসেন্ট জুট মিলস শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোঃ সোহরাব হোসেন, জেজেআই’র সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ মল্লিক, ইস্টার্ন জুট মিলের সাধারণ সম্পাদক এস,এম জাকির হোসেন, স্টার মিলের সভাপতি বেল্লাল মল্লিক, ইস্টার্ন মিলের সভাপতি মোঃ আলাউদ্দিন, আলীম জুট মিল মজদুর ইউনিয়নের সভাপতি সাইফুল ইসলাম লিটু, জেজেআই এর সিবিএ নেতা মোঃ হাসান উল্যা, ক্রিসেন্ট মিলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোঃ পান্নু মিয়া, খালিশপুর জুট মিলের সভাপতি চৌধুরী মিজানুর রহমান মানিক, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান, দৌলতপুর জুট মিলে অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মোঃ হেমায়েত উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক মোঃ আক্তার হোসেন, শ্রমিক নেতা মোঃ দ্বীন ইসলাম, মোঃ আবু জাফর, কাওসার আলী মৃধা, খলিলুর রহমান, হুমায়ন কবির, গাজী মাসুম, সরদার আলী আহমেদ, আঃ সালাম, আঃ রশিদ, আবু হানিফ, মোঃ নুরুল হক, হুমায়ন কবির খান, ইজদান আলী খান, মোঃ হানিফসহ সিবিএ-নন সিবিএ নেতারা।
শ্রমিক আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে বক্তৃতা করেন খুলনা বিভাগীয় ট্যাংকলরী শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মীর মোকেসেদ আলী, মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আরব আলী ও বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীরা।
জনসভায় শ্রমিক নেতারা বলেন, বিজেএমসির আওতাধীন সকল মিলসমূহে প্রায় ৮৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী জড়িত। পাট ও পাটশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বিজেএমসিতে দক্ষ লোকের অভাব। ফলে শ্রমিক-কর্মচারীরা সময়মত মজুরি, বেতন পাচ্ছেনা। এ শিল্পের সাথে প্রায় ৩ কোটি মানুষ জড়িত। এ বিপুল জনগোষ্ঠী আজ দেশি-বিদেশি চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের শিকার। এ সময় মজুরি কমিশন ঘোষণা, প্রত্যেক মিলে বকেয়া মজুরি, ২০% মহার্ঘ ভাতা, ৫০২নং সার্কুলার অনুযায়ী মজুরি প্রদান, খালিশপুর, দৌলতপুর জুট মিলে শ্রমিকদের স্থায়ী করে অন্যান্য মিলের নিয়মে মজুরির ব্যবস্থাসহ ১১ দফা বাস্তবায়নের দাবি জানান। শ্রমিক নেতারা বলেন, বিজেএমসির দুর্নীতির কারণে আজ সারাদেশে পাটকলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিএমআরই ছাড়া ৭০ বছরের পুরানো যন্ত্রপাতি দিয়ে পাটকলগুলো চলছে। অদক্ষ, অব্যবস্থাপনায় টার্গেট উৎপাদন দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। বিজেএমসির কর্মকর্তাদের প্রতারক আখ্যা দিয়ে শ্রমিক নেতারা বলেন, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের অবসর নেওয়ার পর তাদের পি,এফ, গ্রাচ্যুইটি অর্থ প্রদান করেনি। বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা অবসরপ্রাপ্তদের ধোঁকা দিয়েছে। এমনিক মৃত শ্রমিকের বীমার টাকাও প্রদান করেনি বিজেএমসি। পাটকলে উৎপাদিত পাটজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। পণ্য বিক্রি হলেও মিলগুলোতে ৫ থেকে ১২ সপ্তাহ মজুরি প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছে কর্মকর্তরা। শ্রমিকদের গায়ের ঘাম কর্মকর্তাদের ভোগ বিলাস বলেও বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সকল শ্রমিকের বকেয়া মজুরি প্রদান এবং মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন না হলে অন্দোলন চলবে বলে শ্রমিক নেতারা বক্তৃতায় বলেন।
আন্দোলন কর্মসূচির মধ্যে আজ ঢাকা ও চট্টগ্রামে সকাল ১০টায় গেট সভার মাধ্যমে দ্বিতীয় দফার আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। ১৫ জানুয়ারি পাটশিল্প অধ্যুষিত জেলাগুলোতে জেলাপ্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্বারকলিপি পেশে এবং ১৭ জানুয়ারি সকাল ১১টায় লাল পতাকা মিছিল। ২১ জানুয়ারি স্ব-স্ব পাটকলে সকাল ১১টায় রাজপথে লাঠি মিছিল ও ২৪ জানুয়ারি বাসন হাতে ভুখা মিছিল। ২৫ জানুয়ারি সাংবাদিক, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সাথে মতবিনিময় সভা। ২৬ জানুয়ারি স্ব-স্ব শিল্প এলাকায় বেলা ৩টায় শ্রমিক জনসভা। ২৮ জানুয়ারি ৪৮ ঘন্টার হরতাল ও রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল। ৩১ জানুয়ারি সকাল ৮ থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাজপথ, রেলপথ অবরোধ করার কর্মসূচি ঘোষণা করেন শ্রমিক নেতারা। আন্দোলন চলাকালে কর্তৃপক্ষ দাবি না মানলে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের মাধ্যমে কঠোর কর্মসূচি নেওয়া হবে বলে জনসভায় ঘোষণা দেওয়া হয়। এ মুহূর্তে শ্রমিক পরিবারে চরম আর্থিক সঙ্কট চলছে। তাদের এ ন্যায্য দাবি অবিলন্বে পূরণ হবে এমন প্রত্যাশা শ্রমিক পরিবারের।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top