প্রতিদিন শত শত ভ্রমণপ্রিয় মানুষের পদচারণায়  মুখরিত কয়রার কেওড়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র

প্রতিদিন শত শত ভ্রমণপ্রিয় মানুষের পদচারণায় মুখরিত কয়রার কেওড়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র

রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা)
প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবনের কোলঘেঁষে অবস্থিত কয়রার কেওড়াকাটা হাতছানি দিচ্ছে খুলনার অন্যতম নয়নাভিরাম পর্যটন কেন্দ্রের। সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ বৃক্ষরাজিতে ঠাসা কেওড়াকাটার নীরব আহ্বান প্রকৃতিপ্রেমী যে কারোর হৃদয় জয় করবে নিমিষেই। চারদিক সবুজ রাজত্বের প্রধান আকর্ষণ সুন্দরবনাঞ্চলীয় বাহারি সব গাছের সাজানো পসরা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ আইলা ও সিডরের ভয়াবহ ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই কয়রার কিছু উদ্যমী তরুণ কেওড়াকাটাকে অভয়ারণ্য পর্যটন গড়ার সামাজিক আন্দোলন ত্বরান্বিত করছে। সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলেই কেওড়াকাটা হবে সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণ ও দক্ষিণ খুলনার অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র – এমনটাই বিশ্বাস কয়রার তরুণ প্রকৃতি প্রেমীদের। পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনকে ঘিরে বাংলাদেশ অংশের সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে কমবেশি বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠলেও উপকূলীয় খুলনাকে ঘিরে এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি কোন উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র। অব্যাহত প্রাকৃতিক দুর্যোগের চোখ রাঙানিকে জয় করে উপকূলীয় জনপদের অবহেলিত কয়রার যুবারা স্বপ্ন দেখছেন, স্বপ্ন দেখাচ্ছেন সুন্দরবন কেন্দ্রিক দৃষ্টি নন্দন কেওড়াকাটার। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে নানা সঙ্কটে ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন যেখানে প্রতনিয়ত আয়তন হারাচ্ছে সেখানে সুন্দরবনের প্রসারতা বৃদ্ধির এই স্বপ্নময় গান ব্যতিক্রমী পর্যটন কেন্দ্র বাস্তবায়নে এগিয়ে যাবে অনেক দূর এমনটাই প্রত্যাশা করছেন জনপদের মানুষ।
ভারত ও বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে বিস্তৃত এ শাসমূলীয় বন (ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট) যার সিংহভাগ বাংলাদেশ অংশে। প্রাকৃতিক এই বনভূমি খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পটুয়াখালী মোট ৫টি জেলার সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত। সুন্দরবনকে ঘিরে বাকি চার জেলায় কমবেশি পর্যটন শিল্প গড়ে উঠলেও খুলনা জেলায় খুব একটা চোখে পড়েনা। খুলনা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত সুন্দবনের কোল ঘেঁষা কয়রা উপজেলার কিছু উদ্যমী তরুণ এ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কেওড়াকাটা পর্যটন অভয়ারণ্য গড়ার সামাজিক আন্দোলন করে আসছে। এক সময় কয়রার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল চলাচলের অনুপযোগী। শিবসা নদী বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল জেলা সদরের সাথে কয়রাকে। তবে এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি শিবসা নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে ব্রিজ। এমন অবস্থায় ২০১৫ সালে কয়রার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা কয়রা উপজেলা প্রশাসন ও বনবিভাগের সহায়তায় পর্যটন কেন্দ্রের দাবিতে সুন্দরবন ভ্রমণ করে এলাকায় ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কয়রা সদর থেকে ৭ কি.মি পূর্বে ৬নং কয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকাটি পর্যটনের জন্য খুবই সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন এলাকাবাসী। খুলনা থেকে ১১০ কি.মি দক্ষিণের এই কেওড়াকাটায় যাওয়ার জন্য খুলনার সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি বাসযোগে (বাসভাড়া ১৫০ টাকা জনপ্রতি, সময় লাগবে ৫ ঘণ্টা) কয়রা সদরে পৌঁছে মদিনাবাদ মডেল হাইস্কুল মোড় থেকে ইজিবাইক/মোটরসাইকেলযোগে (ইজিবাইক ২০ টাকা, মোটরসাইকেল ৩০ টাকা জনপ্রতি) মাত্র ১৫ মিনিটে পৌঁছানো যাবে।
অন্যদিকে জলপথেও রয়েছে বিকল্প ব্যবস্থা। খুলনা নতুন বাজার লঞ্চঘাট থেকে প্রতিদিন সকাল ১১.৪৫ মিনিটে ছেড়ে আসা এমভি ফারিয়া সাদিয়া লঞ্চযোগে (সময় লাগবে ৮ ঘন্টা, ভাড়া জন প্রতি ১২০ টাকা) পর্যটন কেন্দ্রে পৌঁছানো সম্ভব। নামতে হবে ৫নং ও ৬নং কয়রা লঞ্চঘাটে (লঞ্চঘাটের পাশেই পর্যটন স্পট)। কয়রা সদরে স্বল্প খরচে থাকার জন্য রয়েছে কয়েকটি আবাসিক হোটেল। স্বল্প খরচে ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে দেখা যাবে। রয়েছে বিশাল এলাকাজুড়ে নয়নাভিরাম গোলপাতা ট্রি প্ল্যান্ট প্রজেক্ট দলবেঁধে পিকনিক করারও রয়েছে সুব্যবস্থা। এছাড়া অবলোকন করা যাবে এ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্তিক জনগোষ্ঠী আদিবাসী মু-া সম্প্রদায়ের বৈচিত্রময় জীবনাচার। সামাজিক বনায়ন আন্দোলনের উদ্যোক্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সংগঠক আশিকুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের অসংখ্য পর্যটন স্পটের মতো তারাও যুক্ত হতে চান অর্থনৈতিক গুরুত্ব। এলাকাবাসী বিশেষ করে তরুণ সমাজকে এই পর্যটন আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে তাদের সামাজিক উন্নয়ন কর্মকা-ে-উৎসাহিত করে সমাজে ইতিবাচক ভূমিকায় উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব। পর্যটন কেন্দ্রের অন্যতম উদ্যোক্তা শফিকুল ইসলাম, এনামুল হক, মোজাহিদ, শাহাজান হাওলাদার, ইমরান হোসেন এরা সকলেই বলেন, মাদক ও অন্যান্য অসামাজিক কার্যকলাপের কবল থেকে তারণ্যকে মুক্ত রাখার জন্য এই প্রয়াসের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই কেওড়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র করা হলে এ জনপদের ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব, তারই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। স্থানীয় জনসাধারণের অভিমত, লোকাল প্রশাসন, বন বিভাগ ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের সুনজর পড়লে এই স্থানটি হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। সরকার রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলটির সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন। দেশীয় জীব বৈচিত্রের স্পর্শ লাভে সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালার যথাযথ অনুসরণ করে সকলকে কেওড়াকাটায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top