হুমকির বিষয়ে অভিযোগ করেও রাজিনকে রক্ষা করতে পারলাম না : আক্ষেপ মায়ের

হুমকির বিষয়ে অভিযোগ করেও রাজিনকে রক্ষা করতে পারলাম না : আক্ষেপ মায়ের

জামান ফকির : ফাহমিদ তানভীর রাজিন (১৩)। খুলনা পাবলিক কলেজের সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র ছিল। বিভিন্ন কৃতিত্বের জন্য একাধিকবার পুরস্কৃতও হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন ছিল মা-বাবার। কিন্তু সে স্বপ্ন এখন শুধুই অতীত। তুচ্ছ ঘটনায় জীবন প্রদীপ নিভে গেছে তার। বখাটে কিশোরদের ধারালো চাকু কেড়ে নিয়েছে তার প্রাণ।
এদিকে, রাজিনকে হুমকির বিষয়টি তার মা সহকর্মী শিক্ষক এসএম ইকবাল হোসেনকে অবহিত করেন। ইকবাল হোসেন তার পার্শ্ববর্তী ছাত্রলীগ নেতা শেখ হাসিবুর রহমানকে বিষয়টি জানান। এ পর্যন্তই থেমে থাকে। কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেওয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেননি তারা। ফলে বখাটেরা আরও বেপরোয়া হয়ে হত্যাকা-ের মত অপরাধ ঘটানোর সাহস পায়।
পারিবারিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ফাহমিদ তানভীর রাজিনের মা রেহানা খাতুন ও মৌমিতা তাবাচ্ছুমের মা কারিমা বেগম এবং ইত্তেসাব শাবাবের বাবা এসএম ইকবাল হোসেন মেট্রো পুলিশ লাইন হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। তারা পরস্পর সহকর্মী। এ তিন শিক্ষকের বাসাও কাছাকাছি। এছাড়া তাদের তিন সন্তানও একই শ্রেণিতে অর্থাৎ সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করে। তবে, মৌমিতা পুলিশ লাইন স্কুলে পড়লেও রাজিন ও শাবাব পাবলিক কলেজে পড়তো। সঙ্গত কারণেই সহকর্মীরা সন্তানদের একসঙ্গে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য একজন শিক্ষক ঠিক করেন। সে মোতাবেক পুলিশ লাইন স্কুল সংলগ্ন ১৩ নম্বর রোডে শিক্ষক এসএম ইকবাল হোসেনের বাসায় পড়ার স্থান নির্ধারণ করা হয়। চলতি মাস থেকেই শুরু হয় তাদের প্রাইভেট পড়া। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজিনের বাসা পেছনে হওয়ায় সে আগে বের হয়ে পার্শ্ববর্তী বাসা থেকে মৌমিতাকে সঙ্গে নিয়ে শাবাবদের বাসায় পড়তে যেত। পড়া শেষে আবার মৌমিতাকে তার বাসায় দিয়ে রাজিন নিজের বাসায় চলে যেত। আর মৌমিতাকে সঙ্গে করে যাওয়া-আসাকে ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি বখাটে আলিফ ও তার বন্ধুরা। যে কারণে মৌমিতার সঙ্গে আসা-যাওয়া না করতে একাধিকবার রাজিনকে থ্রেটও করে তারা। বিষয়টি রাজিন তার মা’কে জানায়।
রাজিনের মা রেহানা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, ‘রাজিন তাকে বলেছিল, আম্মু মৌমিতার সঙ্গে প্রাইভেট পড়তে যাওয়া-আসা করতে তাকে নিষেধ করেছে আলিফ’। তিনি বিষয়টি শোনার পরই সহকর্মী ম্যাথের শিক্ষক এসএম ইকবাল হোসেনকে জানান। তিনি ছাত্রলীগ নেতা হাসিবকে বলে ঠিক করে দেন এবং বলেন, তারা আর ডিস্টার্ব করবে না। কিন্তু সেই আলিফ-ফাহিমই তার ছেলেকে চাকু মেরে হত্যা করলো, তাকে বাঁচানো গেল না।
বিষয়টি স্বীকার করে মট্রো পুলিশ লাইন হাইস্কুলের শিক্ষক এসএম ইকবাল হোসেন মঙ্গলবার দুপুরে এ প্রতিবেদককে বলেন, কম দূরত্ব, নিরাপত্তা এবং ভালো টিচিং’র স্বার্থে তিন সহকর্মীর তিন সন্তানকে তার বাসায় প্রাইভেট পড়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু আসা-যাওয়ার পথে রাজিনকে আলিফ নামে একটি ছেলে হুমকি দেয় বলে তার মা কয়েকদিন আগে তাকে জানান। বাচ্চাদের হওয়ায় তিনি বিষয়টি হাস্যকর হিসেবে দেখেন। তারপরও তিনি বিষয়টি খালিশপুর থানা ছাত্রলীগ নেতা এবং তার প্রাক্তন ছাত্রী হাসিবকে জানান। বলেন, ‘বিষয়টি কি তোমরা দেখবা, না-কি আমরা দেখবো’, তখন হাসিব জানায়, ‘সে বিষয়টি দেখছে এনিয়ে চিন্তা করতে হবে না’। এরপর আর তিনি এ বিষয়ে খোঁজ খবর নেননি।
খালিশপুর থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ হাসিবুর রহমান বলেন, ‘ইকবাল স্যার বিষয়টি তাকে জানানোর পর তিনি ১৪ নম্বর রোডের মোয়াজ্জেম স্যারের ছেলে আলিফকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন, কিন্তু সে বিষয়টি অস্বীকার করে’। যে কারণে তিনি আর বিষয়টি নিয়ে এগোননি। কিন্তু ঘটনার পর দেখতে পান, ‘এ আলিফ, ওই আলিফ নয়, আর হুমকিদাতা আলিফকে ওই সময় তিনি চিহ্নিত করতে না পারায় বিষয়টি তাকে বলতেও পারেননি।
উল্লেখ্য, ২০ জানুয়ারি রাত সোয়া ৯টায় খুলনা পাবলিক কলেজ ক্যাম্পাসে কনসার্ট চলাকালে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় ফাহমিদ তানভীর রাজিনকে। খুলনা পাবলিক কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। এ ঘটনায় রাজিনের পিতা শেখ জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে রোববার খালিশপুর থানায় ৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৮-১০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় পুলিশ নগরীর মুজগুন্নি আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ও সেনা সদস্য আলমগীর হোসেনের ছেলে আসিফ প্রান্ত আলিফ (১৬), নগরীর বড় বয়রা আফজালের মোড় এলাকার জাকির হোসেন খানের ছেলে মো. জিসান খান ওরফে জিসান পারভেজ (১৬), বড় বয়রা এলাকার মো. আহাদ হোসেনের ছেলে তারিন হাসান ওরফে রিজভী (১৩), রায়েরমহল মুন্সিবাড়ির চিনির ভাড়াটিয়া সাইদ ইসলামের ছেলে মো. সানি ইসলাম ওরফে আপন (১৩), বড় বয়রা সবুরের মোড় এলাকার বিএম লিয়াকত হোসেনের ছেলে বিএম মাজিব হাসান রয়েল (১৪), নগরীর ছোট বয়রা শ্মশানঘাট এলাকার জাকির হাওলাদারের পুত্র মঞ্জুরুল ইসলাম সাব্বির হাওলাদার (১৭) এবং ছোট বয়রা ইসলামিয়া কলেজ রোড এলাকার ৭ নম্বর আনিস নগরের এসএম আব্দুল মজিদের পুত্র সাক্রান সালেহ মিতুলকে (১৪) আটক করে।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top