স্মৃতি সংরক্ষণ না হওয়ায় ভাষাসৈনিক লোকমান হাকিমের আক্ষেপ

স্মৃতি সংরক্ষণ না হওয়ায় ভাষাসৈনিক লোকমান হাকিমের আক্ষেপ

ভাষা আন্দোলনে খুলনার কেন্দ্র তৃপ্তি নিলয় আজ বইয়ের দোকান

খলিলুর রহমান সুমন
খুলনায় ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল সদর থানার মোড়ে অবস্থিত কেডি ঘোষ রোডস্থ বিএনপির অফিসের বিপরীত পাশে তৃপ্তি নিলয় রেস্টুরেন্ট নামের গোলপাতার ঘর। বর্তমানে সেখানে গড়ে উঠেছে বুক সোসাইটি নামের বইয়ের দোকান। দেবেন বাবুর রেস্টুরেন্ট হিসেবেও ছিল ব্যাপক পরিচিত। তিনি এই রেস্টুরেন্টের নাম রাখেন তৃপ্তি নিলয়। ওইখানে বসেই ভাষা আন্দোলনের সব রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি সংরক্ষণ হয়নি। খুলনার প্রথম ভাষা শহীদ আনোয়ারের স্মৃতিও বর্তমান প্রজন্ম জানতে পারছে না। কারণ তার স্মৃতিতে কোন স্থাপনা নেই। ভাষাসৈনিকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি। ফলে মৃত্যুর পর ভাষাসৈনিকরা রাষ্ট্রীয় সম্মান পায় না। অথচ এ ভাষা আন্দোলনের সিঁড়ি ধরেই স্বাধীনতা আসে। কিন্তু ভাষাসৈনিকরা অবহেলিত।
এভাবেই আক্ষেপ করলেন ভাষাসৈনিক আলহাজ লোকমান হাকিম। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, খুলনার তৃপ্তি নিলয় ঘরে (বর্তমানে বুক সোসাইটি) করা হত সভা। ওইখানে বসেই ভাষা আন্দোলনের সব রূপরেখা চূড়ান্ত করা হত। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৃপ্তি নিলয়ে গিয়ে জানা যায়, ২১ ফেব্রুয়ারি’৫২ ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলি হয়েছে। এ খবর নিশ্চিত হলাম খুলনা জেলা পুলিশ লাইনের অপারেটরের মাধ্যমে। তখনই আমরা তৃপ্তি নিলয়ে জড়ো হয়ে বাংলাভাষার দাবিতে ও ছাত্রদের ওপর গুলি করার প্রতিবাদে সকাল ১১টার দিকে মিছিল বের করি। মিছিলে তিনি স্লোগান দেন। মিছিলটি সদর থানার সামনে আসলে তখনকার বাঘা এসপির নেতৃত্বে মিছিলে বাধা দেওয়া হয়। মিছিল থেকে পুলিশ বিএল কলেজ ছাত্র ও সাতক্ষীরার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন, মালিক আতাহার, কম. নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান লিচু মোল্যাসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে থানায় রেখে নির্মম নির্যাতন করে। পরে তাদের কারাগারে প্রেরণ করা হয়। তিনিসহ অন্যরা দৌঁড়ে পালিয়ে রক্ষা পান। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারী করে। তবে ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেনকে খুলনা কারাগার থেকে স্থানান্তর করা হয় রাজশাহী কারাগারে। তাকে কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে রাখা হয়। মিছিল থেকে সেদিন যারা গ্রেফতার হয়েছিল তার মধ্যে মালিক আতাহার পরে রাজনীতিতে নিস্ক্রীয় হন। এদিকে একই দিনে খুলনা নগরীর পিটিআই মোড়ে মাজেদা আলীর নেতৃত্বে মহিলারা মিছিল বের করে। মিছিলটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। পুলিশের হুলিয়া মাথায় নিয়ে আন্দোলনকারীরা আত্মগোপনে থেকে সভা করতে থাকেন। সে সভার সিদ্ধান্ত মতে ২৩ ফেব্রুয়ারি’৫২ বেলা ৩টায় শহীদ হাদিস (গান্ধী) পার্কে বাংলা ভাষার দাবিতে সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। ওই দিন দৌলতপুর বিএল কলেজ, মুহসিন কলেজ, ফুলতলা এলাকায় সকালে যে যার মত চলে যাওয়া হয়। তিনিসহ লিচু মোল্যা ফুলতলায় গিয়ে ছাত্রদের জড়ো করে মিছিল বের করেন। মিছিল করার সময় মুসলীম লীগ নেতা সরোয়ার মোল্যার নেতৃত্বে একদল লোক বাধা দেয়। এ সময় ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণ ও বাজারের দোকানদারদের সহযোগিতায় সকল দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিকেলে ট্রেন ও বাসযোগে যে যার মত হাদিস পার্কে সমবেত হন। এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন খুলনার পাইকগাছার বাসিন্দা এম এ গফুর। পুরো হাদিস পার্ক লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। সমাবেশে আন্দোলন অব্যাহত রাখার জন্য কেন্দ্রের মাওলানা ভাসানীসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে পরবর্তী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
লোকমান হাকিম ছোটবেলা থেকেই রাজনৈতিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। সেখান থেকেই তিনি দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানবতার পাশে দাঁড়ান। তিনি খুলনা হিরোজ ক্লাবে শৈশব ও কৈশর কাটিয়েছেন। ক্লাবটি পরিচালনা করতেন ফেরদৌস আহমেদ, মোচওয়ালা আব্দুল জলিল, আবু চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। তিনি খেলাধুলার ফাঁকে রাজনীতিবিদদের সাথে তৎকালীন তৃপ্তি নিলয় রেস্টুরেন্ট নামে গোলপাতার ঘরে ভাষা আন্দোলন নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হতেন। সেই আলোচনা থেকেই তিনি ভাষা আন্দলনে রাজপথে সম্পৃক্ত হন। তিনি আন্দোলন চলাকালীন সময় একাধিকবার গ্রেফতার, পুলিশী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং কারাবরণ করেছেন।
তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখনও সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রচলন হয়নি। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি (১৯৯৬ সাল) দিলেও আমাদের উচ্চ আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বাংলা ভাষা চালু হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ভাষা আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন। আজ মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করা হলেও ভাষাসৈনিকদের উপেক্ষা করা হচ্ছে। মৃত্যুর পর ভাষাসৈনিকদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হচ্ছে না। অবিলম্বে তাদের অবদানের স্বীকৃতিসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলের জোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ভাষাসৈনিকরা আজ নানাভাবে উপেক্ষিত। তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির মাধ্যমে মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া ভাষা আন্দোলনে খুলনার প্রথম শহীদ ভাষাবীর আনোয়ার হোসেনের স্মৃতি রক্ষার জোর দাবি এ নেতার।
তিনি বলেন, খুলনা মহানগরীর কেডি ঘোষ রোডস্থ বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের বিপরিত পাশে তৃপ্তি নিলয় রেস্টুরেন্ট নামের গোলপাতার ঘর ভাষা আন্দোলনে খুলনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু আজ সেখানের কোন চিহ্ন নেই। সেখানে এখন বুক সোসাইটি নামের বই বিক্রির দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। ভাষাসৈনিকদের প্রতি সম্মান রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তৃপ্তি নিলয়কে সংরক্ষণ করা উচিত ছিল। এ তৃপ্তি নিলয় বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা দরকার। এছাড়া ভাষা আন্দোলনের সময় প্রথম শহীদ হন খুলনা বিএল কলেজের ছাত্র নেতা আনোয়ার হোসেন। তাকে খুলনা থেকে গ্রেফতার করে রাজশাহী কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। কৃষক নেতা আব্দুল হকসহ অন্যান্য ভাষা আন্দোলনকারী নেতাদের সাথে তাকেও কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে রাখা হয়। ওই ওয়ার্ডের কারাবন্দীরা বাংলাভাষার দাবিতে অনশন শুরু করে কারাগারে বসে। এ সময় পুলিশ কারাগারের পাগলা ঘন্টা বাজিয়ে তাদেরকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। এতে ছাত্র নেতা আনোয়ার হোসেন শহীদ হন এবং কৃষক নেতা আব্দুল হকসহ অনেকে গুলিবিদ্ধ হন। কিন্তু তার স্মৃতি রক্ষায় খুলনায় উদ্যোগ নেই। বর্তমান প্রজন্ম এ মহান ভাষাবীরকে চেনে না।
উল্লেখ্য, ভাষাসৈনিক আলহাজ লোকমান হাকিম ১৯৪০ সালে খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামে মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মৃত ইউনুস আলী মোল্লা, মাতা মৃত রহিমা বেগম। তার ৪ ভাই ও ৫ বোন। তিনি দৌলতপুর হাজী মুহাম্মদ মুহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর তিনি দৌলতপুর বিএল কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন। লেখাপড়া করা অবস্থায় তিনি ১৯৬০ সালে খুলনার বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে যোগদান করেন। পরে তিনি বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্টোরকিপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ পার্টিতে সক্রিয় কর্মী ছিলেন। বর্তমানে তিনি খালিশপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন কেন্দ্রের (পাওয়ার হাউজগেট) বিপরীত পাশে বিআইডিসি সড়কের নিজ বাসভবনে বসবাস করছেন। স্ত্রী, দু’ছেলে ও চার মেয়ে নিয়ে তাঁর পরিবার। তিনি ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে বেশ অবদান রেখেছেন। ভাষা আন্দোলনে বিশেষ অবদান রাখায় তাঁকে মাওলানা ভাসানী ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড’১২ প্রদান করা হয়। বর্তমানে তার বয়স ৭৮ বছর। তিনি এখনও একা একা চলাফেরা করতে পারেন। তিনি বর্তমানে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন খুলনা মহানগর কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বিভিন্ন বই পড়ে, সামাজিক সংগঠনের সাথে কাজ করে সময় অতিবাহিত করেন।
ভাষাসৈনিক লোকমান হাকিম বলেন, খুলনার তৃপ্তি নিলয় নামক রেস্টুরেন্টে (বর্তমানে বুক সোসাইটি) করা হত সভা-আড্ডা। ওইখানে বসেই ভাষা আন্দোলনের সব রূপরেখা চূড়ান্ত করা হত। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৃপ্তি নিলয়ে গিয়ে জানা যায়, ২১ ফেব্রুয়ারি’৫২ ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলি হয়েছে। এ খবর নিশ্চিত হলাম খুলনা জেলা পুলিশ লাইনের অপারেটরের মাধ্যমে। তখনই আমরা তৃপ্তি নিলয়ে জড়ো হয়ে বাংলাভাষার দাবিতে ও ছাত্রদের ওপর গুলি করার প্রতিবাদে সকাল ১১টার দিকে মিছিল বের করি। মিছিলে তিনি স্লোগান দেন। মিছিলটি সদর থানার সামনে আসলে তখনকার বাঘা এসপির নেতৃত্বে মিছিলে বাধা দেওয়া হয়। মিছিল থেকে পুলিশ বিএল কলেজ ছাত্র ও সাতক্ষীরার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন, মালিক আতাহার, কম. নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান লিচু মোল্যাসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে থানায় রেখে নির্মম নির্যাতন করে। পরে তাদের কারাগারে প্রেরণ করা হয়। তিনিসহ অন্যরা দৌঁড়ে পালিয়ে রক্ষা পান। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারী করে। তবে ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেনকে খুলনা কারাগার থেকে স্থানান্তর করা হয় রাজশাহী কারাগারে। তাকে কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে রাখা হয়। মিছিল থেকে সেদিন যারা গ্রেফতার হয়েছিল তার মধ্যে মালিক আতাহার পরে রাজনীতিতে নিস্ক্রীয় হন। এদিকে একই দিনে খুলনা নগরীর পিটিআই মোড়ে মাজেদা আলীর নেতৃত্বে মহিলারা মিছিল বের করে। মিছিলটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। পুলিশের হুলিয়া মাথায় নিয়ে আন্দোলনকারীরা আত্মগোপনে থেকে সভা করতে থাকেন। সে সভার সিদ্ধান্ত মতে ২৩ ফেব্রুয়ারি’৫২ বেলা ৩টায় শহীদ হাদিস (গান্ধী) পার্কে বাংলা ভাষার দাবিতে সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। ওই দিন দৌলতপুর বিএল কলেজ, মুহসিন কলেজ, ফুলতলা এলাকায় সকালে যে যার মত চলে যাওয়া হয়। তিনিসহ লিচু মোল্যা ফুলতলায় গিয়ে ছাত্রদের জড়ো করে মিছিল বের করেন। মিছিল করার সময় মুসলীম লীগ নেতা সরোয়ার মোল্যার নেতৃত্বে একদল লোক বাধা দেয়। এ সময় ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণ ও বাজারের দোকানদারদের সহযোগিতায় সকল দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিকেলে ট্রেন ও বাসযোগে যে যার মত হাদিস পার্কে সমবেত হন। এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পাইকগাছার এম এ গফুর। পুরো হাদিস পার্ক লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। সমাবেশে আন্দোলন অব্যাহত রাখার জন্য কেন্দ্রের মাওলানা ভাসানীসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে পরবর্তী কর্মসূচি গ্রহণ করা হত।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top