‘খুলনার জুট মিলে অগ্নিকাণ্ডেরসূত্র রহস্যাবৃত’

‘খুলনার জুট মিলে অগ্নিকাণ্ডেরসূত্র রহস্যাবৃত’

তিন সংস্থার তদন্ত কমিটি মাঠে
৭৫ কোটি টাকা ক্ষতির দাবি
১৫৫ কোটি টাকার বীমা

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান : দু’দিনেও নেভেনি খুলনার আটরা বাইপাস সড়ক এলাকার এফ আর জুট মিলস লিমিটেডের ভয়াবহ আগুন। বুধবারও পোড়া পাট ও সূতার ভেতর থেকে থেমে থেমে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। তবে, আগুন যাতে আর ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ড্যাম্পিং এর কাজ করছেন।
এদিকে, এফআর জুট মিলে ভয়াবহ এ অগ্নিকা-ের সূত্রপাত এখনও রহস্যাবৃত রয়েছে। অগ্নিকা- সংঘটিত গুদামগুলোতে কোন ধরনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকলেও মিল কর্তৃপক্ষ বৈদ্যুতিক সর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করছেন। এছাড়া মালিক পক্ষ আগুনে ক্ষতির পরিমাণ ৭৫ কোটি টাকা দাবি করে থানায় জিডি করেছেন। তবে, ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ এখনও আগুন লাগার কারণ এবং ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে পারেননি।
অপরদিকে, মিলে অগ্নিকা-ের কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, ব্যাংক ঋণ এবং ইন্স্যুরেন্স দাবিসহ সার্বিক বিষয় অনুসন্ধানে তিনটি সংস্থার পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটি ইতোমধ্যেই সরেজমিনে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
এর আগে মঙ্গলবার বেলা আড়াইটার দিকে এফআর জুট মিলে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। আগুনে মিলের ৪টি গোডাউনের পাট এবং পাটজাতদ্রব্য-সূতা পুড়ে যায়। এর পর থেকেই ফায়ার সার্ভিসের ৭টি এবং নৌবাহিনীর দু’টি মিলে মোট ৯টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। বুধবার দুপুর পর্যন্ত ঘটনাস্থলে অবস্থান করে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। তবে, পানি সরবরাহ পর্যাপ্ত না থাকায় আগুন নেভানোর কাজ ব্যাহত হয়। একইভাবে আগুনের লোলিহান শিখায় গোডাউনের ছাউনিতে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের রঙিন টিন পুড়ে আগুনের ভয়াবহতা আরো বৃদ্ধি পায়। ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন সদস্যকে সামান্য পানি দিয়ে আগুন নেভানোর কাজ করতে দেখা গেছে। তবে, এ সময় মিল কর্তৃপক্ষের মধ্যে কোন ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা লক্ষ্য করা যায়নি। মিলের মালিক শরীফ ফজলুর রহমান, তার ভাই সোবাহান শরীফ এবং ছেলে শরীফ বদরুজ্জামান মামুনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যেও স্বাভাবিকতা দেখা যায়। এমনকি কর্তৃপক্ষ মিল অভ্যন্তরে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশের ক্ষেত্রেও বিধি নিষেধ জারী করেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে রহস্য সৃষ্টি হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স খুলনার উপ-সহকারী পরিচালক ইকবাল বাহার বুলবুল এ প্রতিবেদককে বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পাটের ভেতরে কোথাও কোথাও থেমে থেমে আগুন জ্বলছে। পুরোপুরি নেভাতে আরও সময় লাগবে। তবে, আগুন যাতে আর ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য ড্যাম্পিং এর কাজ করছেন তারা। তিনি আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে বলেন, যেহেতু গোডাউন এলাকায় কোন ধরনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই। সেহেতু সর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার কোন সম্ভাবনা নেই। অন্য কোনভাবে আগুন লাগতে পারে। তবে, আগুন পুরোপুরি না নেভানো পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ এবং কারণ উদ্্ঘাটন করা সম্ভব হবে না। ২/১ দিনের মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করে তারা সার্বিক বিষয়ে তদন্ত করবেন বলেও জানান তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এফ আর জুট মিলস লিমিটেডের নামে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখায় মোট ১০০ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে প্লেজ লোন ৭০ কোটি টাকা এবং হাইপো লোন রয়েছে ৩০ কোটি টাকা। এছাড়াও মিল প্রজেক্টে ব্যাংকের মোটা অংকের ঋণ বিনিয়োগ রয়েছে।
সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখার সূত্র জানান, ব্যাংকের রেকর্ড অনুযায়ী মিলটিতে আগুন লাগার আগ পর্যন্ত ‘র’ পাট ছিল ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫০১ মণ এবং পাটপণ্য-সূতা (সিআরটি) ছিল ১ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন। যার ব্যাংক মূল্য (অগ্রিম) ৬৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং বর্তমান বাজার মূল্য ৮৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার গোপাল চন্দ্র গোলদার জানান, আগুনে ক্ষতির পরিমাণ, ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ, পাটের মজুদ এবং ইন্স্যুরেন্স দাবিসহ সার্বিক বিষয় অনুসন্ধানে ব্যাংকের পক্ষ থেকে কর্পোরেট শাখার অ্যাসিসটেন্ট জেনারেল ম্যানেজার মো. শহীদুল আলমকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সদস্যরা হলেন কর্পোরেট শাখার অ্যাসিসটেন্ট জেনারেল ম্যানেজার মো. গাজী আল বেরুনী, সিনিয়র প্রিন্সিপ্যাল অফিসার বিশ্বনাথ সোম, সিনিয়র প্রিন্সিপ্যাল অফিসার শেখ মঞ্জুর হোসেন, প্রিন্সিপ্যাল অফিসার মো. হাবিবুর রহমান ও প্রিন্সিপ্যাল অফিসার মো. মিজানুর রহমান। কমিটিকে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এছাড়া মিলের দায়িত্বে থাকা ব্যাংকের প্রতিনিধি (গোডাউন কিপার) মো. শহীদুল্লাহকেও সার্বিক বিষয়ে আলাদা রিপোর্ট দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব রিপোর্ট পাওয়ার পরই সংশ্লিষ্ট সব তথ্য জানা যাবে বলেও উল্লেখ করেন ব্যাংকের এই কর্মকর্তা।
অপরদিকে, এফআর জুট মিলিটেডের নামে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ভবন, মেশিনারিজ এবং পাটসহ সর্বমোট ১৫৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বীমা রয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র পাটের বিপরীতেই রয়েছে ৮৬ কোটি ৫২ লাখ টাকার বীমা। তবে, মোট ১৫৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা বীমার মধ্যে গ্রীণ ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ৭০ শতাংশ এবং কো-ইন্স্যুরেন্স হিসেবে প্রগতি, ইস্টার্ন ও পাইওনিয়ারেরও ১০ শতাংশ করে শেয়ার রয়েছে। এদিকে, আগুনের খবর পেয়ে বুধবারই ঢাকা থেকে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। একই সঙ্গে সার্ভে প্রতিষ্ঠান এশিয়ান, আটলান্টিক ও জনতার পক্ষ থেকেও তিনজন সার্ভেয়ার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (ক্লেমস) মো. কবির আহমেদ চৌধুরী এ প্রতিবেদককে বলেন, গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স এবং তিনটি কো- ইন্স্যুরেন্স মিলে এফআর জুট মিলে মোট ১৫৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বীমা রয়েছে। সার্ভে প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট এবং তাদের পক্ষ থেকে সরেজমিন তদন্ত কার্যক্রম শেষেই ক্ষতি ও আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে জানা যাবে। তবে, ঘটনার দু’ দিন পরও আগুন পুরোপুরি নেভাতে না পারায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক শাহ জাহাঙ্গীর আবেদ বলেন, একই প্রতিষ্ঠানে দুই বছর আগে একদফা আগ্নিকা- ঘটেছিল। সেই সময় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে তাদের কাছে ১৬ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছিল। তবে, পরে তারা রহস্যজনক ভাবে ৮ কোটিতে ক্ষতিপূরণ নিতে সম্মতি জানায়। যদিও এখনও সেই অগ্নিকা-ের ক্ষতিপূরণ নিষ্পত্তি হয়নি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, একই প্রতিষ্ঠানে বার বার আগুন লাগে কিভাবে? বলেন, ঘটনাটি রহস্যজনক।
এদিকে, ভয়াবহ এ অগ্নিকা-ের সূত্রপাত এখনও রহস্যাবৃত রয়েছে। অগ্নিকা- সংঘটিত গুদামগুলোতে কোন ধরনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকলেও মিল কর্তৃপক্ষ বৈদ্যুতিক সর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করছেন। এ সংক্রান্ত বিষয়ে বুধবার মিলের মহাব্যবস্থাপক মো. তাজুল ইসলাম নগরীর খানজাহান আলী থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেছেন, নং-১০৯৩। ডায়রিতে তিনি আগুনে ক্ষতির পরিমাণ ৭৫ কোটি টাকা বলে দাবি করেছেন। আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আগুনে তাদের ৮টি গুদামের সম্পূর্ণ পাট পুড়ে গেছে। এ বিষয়ে জুট মিলের জেনারেল ম্যানেজার মো. তাজুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি কোন কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
খানজাহান আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. লিয়াকত আলী জানান, আগুনে দৃশ্যত ৪টি গুদামের পাট পুড়েছে। তবে, পার্ট পার্ট হয়ে গুদামের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তিনি জানান, আগুন লাগার কারণ উদ্্ঘাটনে থানার পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যার প্রধান তিনি নিজেই। বাকি দু’জন সদস্য হলেন এসআই মো. শওকত আলী ও এসআই বিধান চন্দ্র সানা। তারা আগুনের সূত্রপাত এবং ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে দ্রুত রিপোর্ট জমা দিতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top