পাঁচ বছরে ভৈরবে লবণ বেড়েছে ৭ গুণ

পাঁচ বছরে ভৈরবে লবণ বেড়েছে ৭ গুণ

বিমল সাহা : বিগত পাঁচ বছরে ভৈরব নদের পানিতে লবণের মাত্রা বেড়ে সাত গুণ ছাড়িয়েছে। একই সময়ে খুলনার আশপাশ অঞ্চলের নদীতেও উল্লেখ্যযোগ্যহারে লবণ বেড়েছে। অতিরিক্ত লবণ বাতাস আর পানিতে মিশে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। নদীতে বসবাসকারী মাছ ও জলজ প্রাণীকূলের জীবনচক্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন অবকাঠামোর স্থায়ীত্ব নষ্ট হচ্ছে। উজানে পানি কম বা না আসা, নদী দখল ও গতিপথ পরিবর্তন লবণ বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এখনই উদ্যোগ না নিলে পরিবেশের বিপর্যয় রোধ করা যাবেনা বলে মনে করেন তারা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের মার্চ মাস থেকে ২০১৮ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ভৈরবে লবণ বেড়েছে প্রায় সাত গুণ। পাঁচ বছর আগে ভৈরব নদের নোয়াপাড়া ঘাটে লবণের মাত্রা ছিল ০.৪ পিপিটি। আর এখন এখানে লবণের মাত্রা ৭.২ পিপিটি। একই ভাবে ফুলতলা ঘাটে ০.৬ পিপিটি থেকে বেড়ে ৭.৪ পিপিটি, লবণচরা ঘাটে ৩.১ পিপিটি থেকে বেড়ে ৭.৭ পিপিটি। এছাড়াও একই সময়ে মোংলা পশুর নদীতে ৮.৬ থেকে ১২.১ পিপিটি, রামপাল শেলা নদীতে ৯.০ থেকে ১৩.৮ পিপিটি, বটিয়াঘাটা কাজীবাছা নদীতে ৩.২ থেকে ৭.৯ পিপিটি, সাতক্ষীরা কাকশিয়ালী নদীতে ১২.৬ থেকে ১৩.৮ পিপিটি। পিপিটি (পার্টস পার থাউজেন্ড)। অথচ বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী লবণের মাত্রা ৫ পিপিটির বেশি হলে তা পরিবেশ ও জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি স্বরূপ।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান অনুষদের প্রফেসর আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, নদীর পানিতে লবণ বাড়ার সাথে সাথে তা শোষণ প্রক্রিয়ায় আশপাশ অঞ্চলের মাটিতে প্রবেশ করে। ফলে ওই অঞ্চলের মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়। মাটিতে বসবাসকারী অণুজীবগুলো মারা যায়। উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফসল কমে যায়। এছাড়াও পানির লবণ বাতাসের আর্দ্রতা বাড়িয়ে তোলে। ফলে মাটি ও পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। তিনি আরও বলেন, লবণপানি বাস্পিভূত হয়ে বাতাসে মিশে যায়। এতে করে লোহা ও ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্রে মরিচা আসে। দালানকোঠাসহ বিভিন্ন স্থাপনা তাদের স্থায়ীত্ব হারিয়ে ফেলে।
তিনি মনে করেন, নদীর গতিপথ সচল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পানির ঊর্ধ্বমুখি চাপ বাড়িয়ে নোনা আসা রোধ করা যেতে পারে। যেমন নদীগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে উজানে পানি কম আসে ফলে সাগরের নোনা পানি বহুদূর অবধি অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে। এজন্য উজানে পানি আসতে বাধাগ্রস্ত যাতে না হয় সে জন্য সরকারের উদ্যোগ নিতে হবে।
লবণের মাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মোঃ মিজানুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, “মাটিতে লবণের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে ফসল উৎপাদন হ্রাস পাবে। ধানের থোড় হবে না চিটা বেশি হবে। অনেক জায়গাতে চারাই গজাবে না। দীর্ঘমেয়াদী ভাবে লবণ পানিতে মাছ চাষ করলে সেই মাটিতে ঘাস পর্যন্ত জন্মাবে না।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, মেহেরপুর জেলার ভেতর দিয়ে ভৈরব বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা হয়ে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে। সীমান্ত থেকে মেহেরপুর শহরের পাশ দিয়ে কাথুলি পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার ভৈরব নদ পুরোটাই ধান খেতে পরিণত হয়েছে। এজন্য ভারতে অপর অংশ থেকে ভৈরবে কোন পানিই প্রবেশ করতে পারে না। তাই ধীরে ধীরে প্রতি বছরই ভৈরবে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উজানে পানি প্রবাহ আসতে নদটি পুনঃখনন করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top