কর্মস্থলমুখী খুলনাবাসী টিকিট সঙ্কটে

কর্মস্থলমুখী খুলনাবাসী টিকিট সঙ্কটে

জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ

খলিলুর রহমান সুমন
ঈদের শেষে কর্মস্থলমুখী খুলনাবাসীর দূরপাল্লার বাসের টিকিট পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ঈদের সময় স্বপরিবারে গ্রামের বাড়িতে আসার আগেই স্বপরিবারে ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি আগেভাগে। তাই তো তারা অগ্রিম টিকিট সংগ্রহে ছুটছেন এক বাস কাউন্টার থেকে অপর বাস কাউন্টারে। আগামী ১৯ জুন থেকে ২২ জুন পর্যন্ত বাসের টিকিটের চাপ খুব বেশি। কোনো কোনো কোম্পানির বাসের টিকিট ইতোমধ্যে বিক্রি শেষ হয়েছে। এ সুযোগে যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বাস ম্যানেজারদের বিরুদ্ধে। তবে তারা এ অভিযোগ মানতে নারাজ। তারা বলছে, সরকারের বেঁধে দেওয়া নিয়মেই তারা ভাড়া রাখছেন।
নগরীর বানরগাতী এলাকার রানা পারভেজ ২১ জুনের টিকিটের জন্য এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ছুটছেন। কিন্তু তিনি এসি বাসের টিকিট পাচ্ছেন না। তার বড়ভাই রবিউল ইসলাম ঢাকা থেকে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে খুলনায় আসবেন। আগেভাগে টিকিট সংগ্রহের জন্য বলেছেন। এ জন্য তিনি বড়ভাইয়ের টিকিট সংগ্রহে ছুটছেন। তিনি বলেন, টিকিট সংগ্রহের জন্য সোনাডাঙ্গা, শিববাড়ি ও রয়েলের মোড় সকল বাস কাউন্টার ঘুরে বেড়িয়েছেন। কিন্তু কোথাও ওই দিনের টিকিট পাননি। তিনি বলেন, দাম বেশি রাখা কোনো ব্যাপার নয়, এখন টিকিট পাওয়াই আসল বিষয়।
ঈগল পরিবহণের (বাস) শিববাড়ি মোড় কাউন্টারের ইনচার্জ জাহাঙ্গীর আলম দারা বলেন, গতকাল থেকে ঈগল পরিবহণ কর্মমুখী মানুষের জন্য অগ্রিম টিকিট ছেড়েছেন। এসি টিকিটের চাহিদা বেশি থাকলেও চেয়ার কোচের চাহিদা তেমন নেই। আগামী ১৯-২২ জুন এসি বাসের যাত্রীর চাপ রয়েছে। তবে বিগত দিনে যেমন চাপ ছিল তেমনটি এ ঈদে নেই। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, চেয়ার কোচের যাত্রীরা মাওয়া রুটে ঢাকায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। ওই রুটে টিকিট না পেলে তারপর আরিচা রুটের টিকিট সংগ্রহে নামবে। বর্তমানে এসি টিকিটের দাম রাখা হচ্ছে ১২শ টাকা। তবে অগ্রিম টিকিটের দাম রাখা হচ্ছে ১৬শ টাকা। চেয়ার কোচের ভাড়া ৫৫০ টাকা রাখা হচ্ছে। আর অগ্রিম টিকিটের মূল্য রাখা হচ্ছে ৬১৫ টাকা। যা সরকারি রেট অনুযায়ী ঠিক আছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত মোতাবেক খুলনা থেকে ঢাকাগামী একজন যাত্রীর ভাড়া রাখা হচ্ছে। যেহেতু স্বাভাবিক সময়ে যাত্রী কম থাকে তাই ভাড়া কম রাখা হয়। ঈদের পর চাপ থাকায় যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়া রাখা হয়। বিগত ঈদে কর্মস্থল ফেরত যাত্রীরা টিকিটের জন্য যেভাবে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো এবার তেমন ভিড় দেখা যাচ্ছে না। এবার মাওয়াগামী যাত্রীদের চাপ বেশি বলে তিনি মনে করেন।
সোহাগ পরিবহণ বাসের খুলনার ম্যানেজার শেখ আব্দুল জলিল জানান, আগামী ১৯ জুন থেকে ২২ জুন পর্যন্ত তার কোম্পানির বাসের টিকিটের চাপ রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে চেয়ার কোচের ভাড়া আরিচা রুটে ৫৫০ টাকা আর ঈদের পরের তিন দিন ৬১৫ টাকা করা হয়েছে। মাওয়া রুটে ৪৫০ টাকার পরিবর্তে ৫৫০ টাকা রাখা হচ্ছে। ১৯ আর ২১ জুন টিকিটের চাহিদা বেশি বলে তিনি জানান।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস গ্রিন লাইন পরিবহণের রয়েলের মোড় কাউন্টার টিকিট বিক্রেতা অমিত কুমার রায় জানান, গত ৫ জুন থেকে কর্মস্থলমুখী খুলনাবাসীর অগ্রিম টিকিট ছাড়া হয়। ইতোমধ্যে তাদের সকল টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। বিশেষ করে ফেরি পারাপার বাসের টিকিট। তবে লঞ্চ পারাপার বাসের ২/১টি টিকিট রয়েছে। আগামী ১৯ জুন থেকে ২২ জুন এ চার দিনের কোনো টিকিট নেই। তাদের প্রতিদিন সকালে ২টি ও রাতে ২টি বাস ঢাকার উদ্দেশে খুলনা ত্যাগ করে। তবে লঞ্চ পারাপার বাসের সংখ্যা বাড়িয়ে চারটি করা হয়েছে। বাসের ভাড়া আরিচা রুটে রাখা হচ্ছে ১৩শ টাকা, মাওয়া রুটে ১১শ টাকা এবং লঞ্চ পারাপার ৮শ টাকা রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, তাদের কোম্পানি ঈদের সময় যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া রাখছে না। তারা একই ভাড়া সব সময় রাখছে। যারা নানা অজুহাতে ভাড়া বেশি রাখছে এটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তিনি আরও বলেন, যেহেতু এ খাতটি সেবামূলক খাত। তাই লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়েই পরিবহণ চলাচল অব্যাহত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে কিছু কোম্পানি যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া রাখছে। এটা ঠিক নয়। এটা বন্ধ হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
হানিফ পরিবহণের ম্যানেজার আবু সাহান চৌধুরী জানান, তারা ১০ জুন থেকে অগ্রিম টিকিট ছেড়েছেন। ১৯ জুন থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত টিকিটের চাপ বেশি। তবে এখনও তাদের কাছে অল্প কিছু টিকিট রয়েছে। তিনি বলেন, আরিচা রুটে পরিবহণ ব্যবসায়ীরা এখন লোকসানের মুখে। লাভের মুখে রয়েছে মাওয়া রুটের পরিবহণ ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, সরকারের নিয়ম অনুযায়ী আরিচা রুটে যাত্রী প্রতি ভাড়া আসে ৬২১ টাকা। তারা রাখছে ৬২০ টাকা। তবে স্বাভাবিক সময়ে ভাড়া রাখা হয় ৫৫০ টাকা করে। এসি বাসের ভাড়া ১২শ টাকার স্থলে ১৬শ টাকা রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, যাত্রীসেবা দেওয়ার জন্যই পরিবহণ ব্যবসা ধরে রাখা। এখন গাড়িগুলো খালি যাচ্ছে। প্রতিটি গাড়ি প্রতি ট্রিপে খরচ হয় ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা। তিনি বলেন, এসি বাসের টিকিটের চাপ খুব বেশি। তবে চেয়ার কোচের চাপ তেমন বেশি নয়। এ.কে ট্রাভেলস পরিবহণ খুলনার ম্যানেজার মোঃ হাসান আলী বলেন, গতকাল থেকে অগ্রিম টিকিট ছাড়া হয়েছে। আরিচা রুটের চেয়ে মাওয়া রুটে যাত্রীদের চাপ বেশি। অগ্রিম টিকিটের ক্ষেত্রে ২১ ও ২২ জুন চাপ বেশি। তার বাস আরিচা রুটে চলাচল করে। সেহেতু তাদের টিকিটের চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম বলে তিনি দাবি করেন।
জেলাপ্রশাসক মোঃ আমিন উল আহসান বলেন, এমনই অভিযোগে সোমবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি টিম সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালে পাঠানো হয়। তারা গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পেলেও আইনগতভাবে বাস মালিকদের শাস্তি দেওয়া যায়নি। কারণ হিসেবে বাস মালিকরা জানান, আগে তারা কম ভাড়ায় যাত্রী বহন করেছে। এখন যেহেতু ঢাকা থেকে বাস খালি আসবে খুলনায়। এ জন্য অগ্রিম টিকিট বেশি দামে রাখলেও তা তাদের বেঁধে দেওয়া মূল্যের মধ্যে রয়েছে। ভাড়া যাতে বেশি না নেয় সে ব্যাপারে বাস মালিকদের বলা হয়েছে। তবে আবারও বিষয়টি তদন্তে ম্যাজিস্ট্রেট পাঠানো হবে বলে তিনি জানান।

SHARE THIS NEWS

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top